অধ্যায় ৬: জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব | অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর | Class 7 Science Bengali
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে বৃষ্টিপাতের ধরন, বন্যা-খরা, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনও জড়িত। এই পাঠে আমরা সহজ ভাষায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ, প্রভাব, অভিযোজন এবং তা মোকাবিলার উপায় বুঝব।
এই অধ্যায়ে কী শিখবে?
- সবুজগৃহ প্রভাব ও বিশ্ব উষ্ণায়নের পার্থক্য
- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ ও পরিবেশগত প্রভাব
- বন্যা, খরা ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব
- প্রশমন (Mitigation) ও অভিযোজন (Adaptation)-এর ধারণা
- দৈনন্দিন জীবনে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস
পড়ার টিপস: শুধু উত্তর মুখস্থ না করে প্রতিটি ধারণার সঙ্গে নিজের এলাকার একটি উদাহরণ মিলিয়ে দেখো। যেমন, অতিবৃষ্টি বা বন্যার পরে তোমার এলাকায় কী পরিবর্তন হয়েছে তা লক্ষ্য করো। এতে বইয়ের ধারণার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক বুঝতে সহজ হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার সহজ উপায়
আবহাওয়া হলো কোনো নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের স্বল্পমেয়াদি অবস্থা—যেমন আজ বৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু হলো দীর্ঘ সময় ধরে কোনো অঞ্চলের আবহাওয়ার সাধারণ ধরন। তাই এক দিনের ঠান্ডা বা গরমকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ বলা যায় না; দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তনের প্রবণতা দেখতে হয়।
সহজ উদাহরণ: একটি স্কুলে কোনো দিনে প্রচণ্ড বৃষ্টি হওয়া হলো আবহাওয়ার ঘটনা। কিন্তু বহু বছর ধরে একই অঞ্চলে বৃষ্টির সময়, তীব্রতা বা তাপমাত্রার গড়ে পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা গেলে সেটি জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীর জন্য ছোট কাজ
- এক সপ্তাহ প্রতিদিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তথ্য লিখে রাখো।
- কোন দিন বেশি গরম বা বেশি বৃষ্টি হয়েছে তা চিহ্নিত করো।
- এই এক সপ্তাহের তথ্যকে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুর প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কি না, নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করো।
অনুশীলনী
১. সঠিক উত্তরের গোলটি পূর্ণ করো-
(i) বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান কারণ কোন গ্যাস?
(a) অক্সিজেন
(b) কার্বন ডাই-অক্সাইড
(c) হাইড্রোজেন
(d) নাইট্রোজেন
উত্তর: (b) কার্বন ডাই-অক্সাইড
(ii) নীচের কোনটি সবুজগৃহ (Greenhouse) গ্যাস নয়?
(a) কার্বন ডাই-অক্সাইড
(b) মিথেন
(c) নাইট্রাস অক্সাইড
(d) অক্সিজেন
উত্তর: (d) অক্সিজেন
(iii) জলবায়ু পরিবর্তন বলতে প্রধানত কী বোঝায়?
(a) দৈনিক আবহাওয়ার পরিবর্তন
(b) সাপ্তাহিক আবহাওয়ার পরিবর্তন
(c) দীর্ঘমেয়াদী তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন
(d) ঋতু পরিবর্তনের সাথে জলবায়ুর পরিবর্তন
উত্তর: (c) দীর্ঘমেয়াদী তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন
(iv) অধিক গাছ লাগালে কীসে সাহায্য হয়?
(a) বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধিতে
(b) অক্সিজেন কমাতে
(c) ওজোন গর্ত বৃদ্ধিতে
(d) কার্বন ডাই-অক্সাইড কমাতে
উত্তর: (d) কার্বন ডাই-অক্সাইড কমাতে
২. শূন্যস্থান পূরণ করো
(i) মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সবুজগৃহ গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
(ii) জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়।
(iii) রেফ্রিজারেটর এবং এসি-র মতো শীতলীকরণ যন্ত্র থেকে হাইড্রোফ্লুরোকার্বন নামক সবুজগৃহ গ্যাস নির্গত হয়।
(iv) জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলি ভেঙে পড়ে, যাকে তীর ভাঙন বলে।
(v) ক্রমাগত খরা এবং বৃষ্টিপাতের অভাবের কারণে মরুভূমির সম্প্রসারণ (Desertification) ঘটে।
৩. শুদ্ধ না অশুদ্ধ লেখো-
(i) কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইড হলো সবুজগৃহ গ্যাস। -> শুদ্ধ
(ii) গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে। -> শুদ্ধ
(iii) সবুজগৃহ প্রভাব পৃথিবীর তাপমাত্রা হ্রাস করে। -> অশুদ্ধ
(iv) জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটে না। -> অশুদ্ধ
৪. নীচে দেওয়া অংশগুলো মিলিয়ে লেখো-
ক অংশ খ অংশ (সঠিক উত্তর)
(i) বিশ্ব উষ্ণায়ন (c) পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি
(ii) সবুজগৃহ গ্যাস (a) কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন
(iii) জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব (d) হিমবাহ গলে যাওয়া
(iv) জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকার (b) সবুজ শক্তির ব্যবহার
৫. ভেবে উত্তর দাও-
(i) সবুজগৃহ প্রভাব কী?
উত্তর: সবুজগৃহ প্রভাব (Greenhouse Effect) হলো একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যেখানে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা কিছু গ্যাস (যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি) সূর্যের তাপ ধরে রাখে। এই গ্যাসগুলো পৃথিবীর তাপকে মহাশূন্যে ফিরে যেতে বাধা দেয়, যার ফলে পৃথিবী জীবন ধারণের জন্য অনুকূলভাবে গরম থাকে।
(ii) বিশ্ব উষ্ণায়ন কী?
উত্তর: মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের (যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বনভূমি ধ্বংস করা) ফলে বায়ুমণ্ডলে সবুজগৃহ গ্যাসের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেছে। এর ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তাপ ধরে রাখছে, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রাকে ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে তুলছে। পৃথিবীর এই গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকেই বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) বলে।
(iii) জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা এবং খরা কীভাবে সৃষ্টি হয়?
উত্তর:
- বন্যা: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মেরু অঞ্চল এবং পাহাড়ের চূড়ার হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে, যা সমুদ্র ও নদীর জলস্তর বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক জায়গায় অস্বাভাবিক বা প্রবল বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা বন্যার সৃষ্টি করছে।
- খরা: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে এবং অনেক অঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এর ফলে নদী, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ জলের স্তর শুকিয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
(iv) জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আমরা কী কী পদক্ষেপ নিতে পারি?
উত্তর: জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আমরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে পারি:
১. জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস: কয়লা বা পেট্রোলের পরিবর্তে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও জলবিদ্যুতের মতো সবুজ শক্তি (Green Energy) ব্যবহার করতে হবে।
২. সবুজ পরিবহন: ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে বৈদ্যুতিক যান, সাইকেল বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে হবে।
৩. বিদ্যুৎ সংরক্ষণ: অপ্রয়োজনে ফ্যান বা লাইট বন্ধ রাখা এবং কম বিদ্যুৎ খরচ করে এমন LED বাল্ব ব্যবহার করা।
৪. বনায়ন: বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং অরণ্য ধ্বংস রোধ করতে হবে, কারণ গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে।
(v) মিশন লাইফ (Mission LiFE) কী?
উত্তর: মিশন লাইফ (Mission LiFE – Lifestyle for Environment) হলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ভারতে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন। এটি সাধারণ মানুষকে দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করতে উৎসাহিত করে। যেমন- অপ্রয়োজনে লাইট বন্ধ রাখা, সাইকেল ব্যবহার করা, প্লাস্টিকের ব্যাগের বদলে কাপড়ের থলি ব্যবহার করা এবং জল সংরক্ষণ করা।
(vi) জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন (Adaptation) বলতে কী বোঝায়? এর দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকতে মানুষ যখন তার জীবনশৈলী এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন করে, তখন তাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন বলে।
উদাহরণ:
১. বন্যা প্রবণ অঞ্চলে বন্যা-প্রতিরোধ্য ঘর (যেমন- অসমের চাং ঘর) নির্মাণ করা।
২. কৃষিকাজে খরা এবং বন্যা প্রতিরোধী শস্যের চাষ করা এবং বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করা।
(vii) তোমার মতে জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণীদের প্রভাবিত করছে?
উত্তর: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী তাদের নিজস্ব বাসস্থান বা বাস্তুতন্ত্র হারাচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার কারণে অনেক প্রজাতির গাছপালা এবং প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়াও, মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় মেরু ভল্লুকের মতো প্রাণীদের জীবন হুমকির সম্মুখীন।
অন্বেষণমূলক প্রকল্প (Exploratory Projects)
(শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কাজের জন্য সংক্ষিপ্ত দিকনির্দেশনা)
- জলবায়ু পরিবর্তনের স্থানীয় প্রভাব: তোমার এলাকায় গত কয়েক বছরে বন্যা, খরা বা বৃষ্টিপাতের ধরন কীভাবে বদলেছে তা নিয়ে প্রবীণদের সাথে আলোচনা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করো।
- সোলার প্যানেলের ব্যবহার: তোমার বাড়ির আশেপাশে কেউ সোলার প্যানেল ব্যবহার করলে তার সুবিধা সম্পর্কে জেনে একটি তালিকা তৈরি করো।
- বনায়ন কর্মসূচি: বিদ্যালয়ে বা নিজের বাড়ির আঙিনায় গাছ লাগানোর উদ্যোগ নাও এবং বন্ধুদেরও এতে উৎসাহিত করো।
