অসমে ব্রিটিশ শাসন, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ও কৃষক আন্দোলন | প্রশ্ন ও উত্তর
অসমের ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসনকাল, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ, মণিরাম দেওয়ানের ভূমিকা এবং কৃষক আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নিচে পাঠ্যপুস্তকের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া হলো।
—
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
১. ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে অসমের রাজস্ব সংগ্রহ পদ্ধতির কী পরিবর্তন হয়েছিল?
উত্তর:
ব্রিটিশ শাসনামলে অসমের অর্থনীতিতে মুদ্রার প্রচলন শুরু হয় এবং প্রজা বা কৃষকদের দ্রব্যসামগ্রীর বদলে টাকার মাধ্যমে মাটির খাজনা ও অন্যান্য কর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক করা হয়।
—
২. কোন সালে মোফট মিলস অসমে এসেছিলেন?
উত্তর:
মোফট মিলস ১৮৫৩ সালে অসমের প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনুসন্ধান করতে এসেছিলেন।
—
৩. কেঞা কারা ছিল?
উত্তর:
অসমে ব্রিটিশ প্রবর্তিত মুদ্রা অর্থনীতির ফলে যে সুদখোর মহাজন শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছিল, তাদের মধ্যে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের ‘কেঞা’ বলা হতো।
—
৪. অসমে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে কে নেতৃত্ব দিয়েছিল?
উত্তর:
মণিরাম দেওয়ান অসমে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন।
—
৫. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে অসমের বিদ্রোহীরা কোন আহোম রাজকোঁঅরকে পুনরায় সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিল?
উত্তর:
বিদ্রোহীরা প্রাক্তন আহোম রাজা পুরন্দর সিংহের নাতি কন্দর্পেশ্বর সিংহকে সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিল।
—
৬. মণিরাম দেওয়ানকে কোন বাঙালি মোক্তার সাহায্য করেছিল?
উত্তর:
কলকাতার মধুমল্লিক নামক এক বাঙালি মোক্তার মণিরাম দেওয়ানকে সাহায্য করেছিলেন।
—
৭. মণিরাম দেওয়ানের সঙ্গে আর কাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হয়েছিল?
উত্তর:
মণিরাম দেওয়ানের সঙ্গে পিয়লি বরুয়াকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হয়েছিল।
—
৮. মণিরাম দেওয়ানের বিচার কে করেছিল?
উত্তর:
শিবসাগরের প্রিন্সিপাল অ্যাসিস্টেন্ট ক্যাপ্টেইন হলরয়ড একটি বিশেষ বিচারপীঠের দ্বারা মণিরাম দেওয়ানের বিচার করেছিলেন।
—
৯. অসমের ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের বিফলতার দুটো কারণ উল্লেখ করো।
উত্তর:
বিদ্রোহীদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত নগণ্য এবং তা মূলত শিবসাগর ও যোরহাট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বিদ্রোহের মুখ্য সংগঠক মণিরাম দেওয়ান বিদ্রোহস্থল থেকে অনেক দূরে কলকাতায় অবস্থান করছিলেন।
—
১০. কোন কোন সালে টিকিট কর আর আয়কর প্রবর্তন করা হয়েছিল?
উত্তর:
টিকিট কর ১৮৫৮ সালে এবং আয়কর ১৮৬০ সালে প্রবর্তন করা হয়েছিল।
—
১১. ব্রিটিশ শাসন কালে অসমের কৃষকদের দুরবস্থার দুটো কারণ লেখো।
উত্তর:
ব্রিটিশ সরকার কৃষকদের সামর্থ্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি ভূমি রাজস্ব বা খাজনা ধার্য করেছিল।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীর সময়ও সরকার কৃষকদের কর থেকে কোনো রেহাই দেয়নি।
—
১২. লেফটেনান্ট সিঙ্গার কে ছিলেন?
উত্তর:
লেফটেনান্ট সিঙ্গার ছিলেন নগাঁওয়ের সহকারি উপায়ুক্ত, যিনি ১৮৬১ সালে ফুলগুরি ধাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ কৃষকদের হাতে নিহত হন।
—
১৩. ফুলগুরির ধাওয়া কখন সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর:
ফুলগুরির ধাওয়া ১৮৬১ সালের অক্টোবর মাসে সংঘটিত হয়েছিল।
—
১৪. রঙিয়ার কৃষক বিদ্রোহ কখন সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর:
রঙিয়ার কৃষক বিদ্রোহ ১৮৯৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর শুরু হয়েছিল।
—
১৫. লচিমা কোথায় অবস্থিত?
উত্তর:
লচিমা কামরূপ জিলার বজালি অঞ্চলে অবস্থিত।
—
১৬. লচিমার কৃষক বিদ্রোহ কখন সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর:
লচিমার কৃষক বিদ্রোহ ১৮৯৪ সালের ২১ জানুয়ারি শুরু হয়।
—
১৭. পথরুঘাটের কৃষক বিদ্রোহ কখন হয়েছিল?
উত্তর:
পথরুঘাটের কৃষক বিদ্রোহ ১৮৯৪ সালের ২৮ জানুয়ারি হয়েছিল।
—
১৮. ১৮৬১ সালে জয়ন্তীয়া বিদ্রোহের নেতৃত্ব কে দিয়েছিল?
উত্তর:
১৮৬১ সালে জয়ন্তীয়া বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন উকিয়াং নংবাহ।
—
১৯. ১৮৮১ সালে উত্তর কাছাড়ের জনজাতীয় বিদ্রোহের নেতৃত্ব কে দিয়েছিল?
উত্তর:
১৮৮১ সালে উত্তর কাছাড়ের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শম্ভুধন ফংলোছা।
—
২০. টিকেন্দ্রজিতকে কে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল?
উত্তর:
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ টিকেন্দ্রজিতকে ব্রিটিশ কর্মচারি হত্যা ও বিদ্রোহের অপরাধে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছিল।
—
২১. জে. ডব্লিউ. কুইণ্টনকে কোন সালে হত্যা করা হয়েছিল?
উত্তর:
অসমের চিফ কমিশনার জে. ডব্লিউ. কুইণ্টনকে ১৮৯১ সালে মণিপুরে হত্যা করা হয়েছিল।
দীর্ঘ উত্তর লেখো
১। ১৮৫৭-৫৮ সালের বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর:
১৮৫৭-৫৮ সালের বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম বৃহৎ সশস্ত্র বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক কারণ ছিল।
- ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী নীতির ফলে বহু দেশীয় রাজ্যের স্বাধীনতা নষ্ট হয়েছিল।
- লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি ভারতীয় রাজাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল।
- কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ ও শোষণের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
- দেশীয় শিল্প ধ্বংস হওয়ায় বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে।
- সৈন্যদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্য ছিল।
- এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহারের গুজব সৈন্যদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছিল।
- ব্রিটিশদের সামাজিক ও ধর্মীয় হস্তক্ষেপও মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল।
এই সব কারণ মিলিয়ে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
২। অসমে ১৮৫৭-৫৮ সালের বিদ্রোহে মণিরাম দেওয়ানের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করো।
উত্তর:
মণিরাম দেওয়ান ছিলেন অসমের ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রধান নেতা। তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আহোম রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
- তিনি কন্দৰ্পেশ্বৰ সিংহকে অসমের রাজা করার পরিকল্পনা করেন।
- কলকাতায় অবস্থান করে তিনি বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেন।
- মধুমল্লিক নামের এক বাঙালি মোক্তারের সহায়তায় তিনি ব্রিটিশ বিরোধী ষড়যন্ত্র সংগঠিত করেন।
- পিয়লি বরুয়া, মায়ারাম নজির প্রমুখ অভিজাত ব্যক্তিরা তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন।
- সৈন্যদের বিদ্রোহে উৎসাহিত করার জন্য তিনি গোপনে চিঠিপত্র পাঠান।
- কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ষড়যন্ত্রের খবর পেয়ে যায় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
- বিচার শেষে ১৮৫৮ সালে মণিরাম দেওয়ান ও পিয়লি বরুয়াকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
অসমের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩। কী কী কারণে অসমে ১৮৫৭-৫৮ সালের বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল আলোচনা করো।
উত্তর:
অসমে ১৮৫৭-৫৮ সালের বিদ্রোহ বিভিন্ন কারণে ব্যর্থ হয়েছিল।
- ব্রিটিশ সরকার আগে থেকেই বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রের খবর পেয়ে গিয়েছিল।
- বিদ্রোহীদের মধ্যে ঐক্যের অভাব ছিল।
- পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক শক্তি ছিল না।
- সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ খুব কম ছিল।
- ব্রিটিশ প্রশাসন শক্তিশালী ও সংগঠিত ছিল।
- বিদ্রোহের নেতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
- মণিরাম দেওয়ান ও পিয়লি বরুয়ার মৃত্যুদণ্ড বিদ্রোহকে দুর্বল করে দেয়।
- অসমের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থাও দুর্বল ছিল।
এই সব কারণে বিদ্রোহ সফল হতে পারেনি।
৪। অসমে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করো।
উত্তর:
অসমে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
- এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসমের প্রথম বড় সংগঠিত আন্দোলন।
- এই বিদ্রোহ অসমবাসীর জাতীয় চেতনা জাগ্রত করেছিল।
- আহোম রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল।
- মণিরাম দেওয়ান ও পিয়লি বরুয়ার আত্মত্যাগ অসমবাসীকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
- পরবর্তীকালে কৃষক বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ সুগম হয়।
- ব্রিটিশ শাসনের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে প্রতিবাদী মনোভাব সৃষ্টি হয়।
তাই অসমের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
৫। ফুলগুৰি ধাওয়ার উপর একটি টীকা লেখো।
উত্তর:
ফুলগুৰি ধাওয়া ছিল অসমের কৃষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ। এটি ১৮৬১ সালে নগাঁও জেলার ফুলগুৰিতে সংঘটিত হয়।
- ব্রিটিশ সরকার কৃষকদের ওপর বিভিন্ন কর আরোপ করেছিল।
- বিশেষ করে পান-সুপারি ও অন্যান্য দ্রব্যের ওপর কর বসানোয় কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
- কৃষকেরা প্রতিবাদ সভা সংগঠিত করেন।
- ব্রিটিশ পুলিশ সেই সভা দমন করতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়।
- কৃষকেরা পুলিশকে আক্রমণ করে এবং এক ইংরেজ অফিসার নিহত হয়।
- পরে ব্রিটিশ সরকার কঠোরভাবে বিদ্রোহ দমন করে।
ফুলগুৰি ধাওয়া অসমের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
৬। ১৮৯৪ সালে উত্তর কামরূপে সংঘটিত কৃষক বিদ্রোহ সম্পর্কে আলোচনা করো।
উত্তর:
১৮৯৪ সালে উত্তর কামরূপে কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির নীতির বিরুদ্ধে।
- ব্রিটিশ সরকার ভূমি-রাজস্ব অনেক বাড়িয়ে দেয়।
- দরিদ্র কৃষকেরা এই অতিরিক্ত কর দিতে অসমর্থ হয়ে পড়ে।
- কৃষকেরা সংগঠিতভাবে কর প্রদানে অস্বীকার করে।
- বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ও গণআন্দোলন শুরু হয়।
- ব্রিটিশ সরকার পুলিশ ও সেনা ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করে।
- অনেক কৃষককে গ্রেপ্তার ও শাস্তি দেওয়া হয়।
এই বিদ্রোহ কৃষকদের মধ্যে ঐক্য ও প্রতিবাদী চেতনার পরিচয় বহন করে।
৭। ১৮৯৪ সালে পথারুঘাটে সংঘটিত কৃষক বিদ্রোহের একটি খতিয়ান তুলে ধরো।
উত্তর:
পথারুঘাট কৃষক বিদ্রোহ ১৮৯৪ সালে দরং জেলায় সংঘটিত হয়েছিল।
- ব্রিটিশ সরকার ভূমি-রাজস্ব বৃদ্ধি করায় কৃষকেরা অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে।
- কৃষকেরা কর না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
- পথারুঘাটে কৃষকদের এক বিশাল সভা অনুষ্ঠিত হয়।
- ব্রিটিশ পুলিশ সভা ভাঙতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়।
- পুলিশ গুলি চালায় এবং বহু কৃষক নিহত হন।
- এই ঘটনাকে “পথারুঘাটের রণ” বলা হয়।
এই বিদ্রোহ অসমের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়।
৮। ১৮৫০ সালে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জঙ্গীয়াদের বিদ্রোহের বিষয়ে একটি টীকা প্রস্তুত করো।
উত্তর:
জঙ্গীয়া বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ বিরোধী একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন।
- ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
- বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
- নগাঁও অঞ্চলে এই বিদ্রোহের প্রভাব বেশি ছিল।
- ব্রিটিশ সরকার কঠোরভাবে এই আন্দোলন দমন করে।
- অনেক বিদ্রোহী নিহত ও গ্রেপ্তার হন।
এই বিদ্রোহ অসমে ব্রিটিশ বিরোধী চেতনা জাগ্রত করেছিল।
৯। ১৮৯১ সালে মণিপুরের টিকেন্দ্রজিতের নেতৃত্বে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিদ্রোহের বিবরণ লেখো।
উত্তর:
১৮৯১ সালে মণিপুরে টিকেন্দ্রজিতের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
- ব্রিটিশরা মণিপুরের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছিল।
- টিকেন্দ্রজিত ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করেন।
- ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে মণিপুরের সৈন্যদের সংঘর্ষ হয়।
- এই যুদ্ধে ব্রিটিশ অফিসার জে. ডব্লিউ. কুইন্টন নিহত হন।
- পরে ব্রিটিশ সরকার মণিপুর আক্রমণ করে বিদ্রোহ দমন করে।
- টিকেন্দ্রজিতকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি দেওয়া হয়।
এই বিদ্রোহ উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।
সংক্ষেপে টীকা লেখো
১। অসমে ইংরেজ প্রবর্তিত রাজস্ব ব্যবস্থা
উত্তর:
ইংরেজ শাসনকালে অসমে নতুন রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করা হয়। আগে পণ্য বা শ্রমের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হলেও ব্রিটিশরা নগদ টাকায় ভূমি-রাজস্ব আদায় শুরু করে। রাজস্বের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক কৃষক মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয় এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এই রাজস্ব নীতি অসমে কৃষক অসন্তোষ ও বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল।
—
২। মণিরাম দেওয়ান
উত্তর:
মণিরাম দেওয়ান ছিলেন অসমের একজন বিশিষ্ট দেশপ্রেমিক ও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রধান নেতা। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মণিরাম বরভাণ্ডার বরুয়া। তিনি আহোম রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তিনি গোপনে বিদ্রোহ সংগঠিত করেন। পিয়লি বরুয়া ও অন্যান্য অভিজাত ব্যক্তিরা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ষড়যন্ত্রের খবর পেয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং ১৮৫৮ সালে ফাঁসি দেয়। অসমের ইতিহাসে তিনি একজন শহিদ বীর হিসেবে স্মরণীয়।
—
৩। ফুলগুৰি ধাওয়া
উত্তর:
ফুলগুৰি ধাওয়া ১৮৬১ সালে নগাঁও জেলার ফুলগুৰিতে সংঘটিত একটি কৃষক বিদ্রোহ। ব্রিটিশ সরকার পান-সুপারি ও অন্যান্য দ্রব্যের ওপর কর আরোপ করলে কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কৃষকেরা প্রতিবাদ সভা সংগঠিত করে। পুলিশ সেই সভা ভাঙতে এলে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং এক ইংরেজ অফিসার নিহত হয়। পরে ব্রিটিশ সরকার কঠোরভাবে এই আন্দোলন দমন করে। ফুলগুৰি ধাওয়া অসমের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।
—
৪। নাঙলিয়া কৃষক বিদ্রোহ
উত্তর:
নাঙলিয়া কৃষক বিদ্রোহ ১৮৯৩ সালে সংঘটিত হয়। ব্রিটিশ সরকারের অতিরিক্ত ভূমি-রাজস্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কৃষকেরা এই বিদ্রোহ শুরু করে। দরিদ্র কৃষকেরা কর দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ করে। ব্রিটিশ সরকার পুলিশ ও সেনা পাঠিয়ে বিদ্রোহ দমন করে। এই আন্দোলন কৃষকদের ঐক্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।
—
৫। পথারুঘাটের রণ
উত্তর:
পথারুঘাটের রণ ১৮৯৪ সালে দরং জেলায় সংঘটিত কৃষক বিদ্রোহের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ব্রিটিশ সরকার ভূমি-রাজস্ব বৃদ্ধি করলে কৃষকেরা প্রতিবাদে সামিল হয়। পথারুঘাটে এক বিশাল কৃষক সভা অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশ সভা ভাঙতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং পুলিশ গুলি চালায়। এতে বহু কৃষক নিহত হন। এই ঘটনাকে “পথারুঘাটের রণ” বলা হয়। এটি অসমের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়।
—
৬। অসমে কৃষক বিদ্রোহের গুরুত্ব
উত্তর:
অসমের কৃষক বিদ্রোহগুলো ব্রিটিশ শাসনের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক ছিল। এই বিদ্রোহগুলোর মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে ঐক্য ও রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়। ফুলগুৰি ধাওয়া, নাঙলিয়া বিদ্রোহ ও পথারুঘাটের রণের মতো আন্দোলন অসমবাসীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করেছিল। পরবর্তীকালে জাতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেও এই বিদ্রোহগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
—
৭। টিকেন্দ্রজিৎ
উত্তর:
টিকেন্দ্রজিৎ ছিলেন মণিপুরের একজন বীর স্বাধীনতাসংগ্রামী নেতা। তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ১৮৯১ সালের মণিপুর বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম করেছিলেন। এই সংঘর্ষে ব্রিটিশ অফিসার জে. ডব্লিউ. কুইন্টন নিহত হন। পরে ব্রিটিশ সরকার টিকেন্দ্রজিৎকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি দেয়। তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।
