সাগর সঙ্গমে নবকুমার, Class 10, Chapter 1, SEBA

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের অন্তর্গত ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ পাঠ্যাংশের অনুশীলনীগুলোর উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর

ক) নবকুমার কে?

উত্তর: নবকুমার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র এবং সপ্তগ্রামের অধিবাসী।

খ) নবকুমার সঙ্গীগণ কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়ার প্রধান কারণ কী ছিল?

উত্তর: কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে নবকুমার জোয়ারের তোড়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। তাকে খুঁজতে গিয়ে সঙ্গীরা দেরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাকে ছাড়াই নৌকা ছেড়ে দেয়।

গ) নবকুমার নির্জন সমুদ্রতীরে পরিত্যক্ত হল কেন?

উত্তর: সঙ্গীরা মনে করেছিল নবকুমারকে কোনো বন্য জন্তু খেয়ে ফেলেছে, তাই তারা প্রাণের ভয়ে তাকে রেখেই চলে যায়।

ঘ) ঘুম ভাঙার পর নবকুমার বহুদূরে কী দেখেছিল?

উত্তর: ঘুম ভাঙার পর নবকুমার বহুদূরে সমুদ্রের দিগন্তরেখা এবং সাদা ফেনার রাশি দেখেছিল।

ঙ) কখন কাপালিকের সঙ্গে নবকুমারের সাক্ষাৎ হয়েছিল?

উত্তর: যখন নবকুমার খিদের জ্বালায় এবং আশ্রয়ের খোঁজে সমুদ্রতীরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরছিলেন, তখন এক সন্ধ্যায় বালিয়াড়ির উপরে কাপালিকের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়।

চ) ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’ উক্তিটি কার?

উত্তর: উক্তিটি উপন্যাসের নায়িকা কপালকুণ্ডলার।

ছ) ‘কস্তুং’ শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: ‘কস্তুং’ (কস্ত্বম্) একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ— ‘তুমি কে?’

জ) নবকুমার জাতিতে ছিল— (শূন্যস্থান পূর্ণ করো)।

উত্তর: নবকুমার জাতিতে ছিল— ব্রাহ্মণ।

ঝ) নবকুমার পর্ণকুটিরে কী খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছিল?

উত্তর: নবকুমার পর্ণকুটিরে কাপালিকের দেওয়া ফলমূল খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছিল।

ঞ) অস্পষ্ট সন্ধ্যাালোকে কে নবকুমারকে পর্ণকুটিরের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল?

উত্তর: এক সুন্দরী রহস্যময়ী নারী (কপালকুণ্ডলা) নবকুমারকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

ট) “কাপালিক মনুষ্য, আমিও মনুষ্য” উক্তিটি কার?

উত্তর: উক্তিটি নবকুমারের।

ঠ) কাপালিকের পর্ণকুটিরে নবকুমার কী দেখেছিল?

উত্তর: কাপালিকের পর্ণকুটিরে নবকুমার বাঘের চামড়া, কঙ্কাল এবং তান্ত্রিক সাধনার বিভিন্ন উপকরণ দেখেছিল।

ড) কাপালিকের বয়স কত ছিল?

উত্তর: কাপালিকের বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ বছর ছিল।

ঢ) প্রাতে উঠে নবকুমার কী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল?

উত্তর: সকালে উঠে নবকুমার সেখান থেকে পালাবার বা লোকালয়ে ফেরার পথ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।






২) সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও

ক) ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ পাঠটি কার লিখিত কোন গ্রন্থের অন্তর্গত?
উত্তর: ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ পাঠটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের অন্তর্গত।

খ) নবকুমার কোথায়, কীভাবে পরিত্যক্ত হয়েছিল?
উত্তর: কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে নবকুমার জোয়ারের তোড়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। তাকে খুঁজতে গিয়ে সঙ্গীরা দেরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাকে ছাড়াই নৌকা ছেড়ে দেয়।

গ) কী রূপ পরিস্থিতিতে কী কারণে নবকুমার বিজন বনে পরিত্যক্ত হয়েছিল?
উত্তর: নবকুমার সমুদ্রতীরবর্তী নির্জন স্থানে একা পড়ে যায়। নৌকা দূরে সরে যাওয়া ও সঙ্গীদের ফিরে না আসার কারণে সে বিজন বনে পরিত্যক্ত হয়েছিল।

ঘ) কাপালিককে নবকুমার কোথায় কী অবস্থায় দেখতে পায় তা লেখো।
উত্তর: নবকুমার একটি উঁচু বালিয়াড়ির উপর আগুনের পাশে কাপালিককে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখতে পায়।

ঙ) নবকুমার কার সহায়তায় কেমন করে পুনরায় পরকুটিরে পৌঁছতে পেরেছিল?
উত্তর: কপালকুণ্ডলার সহায়তায় নবকুমার পুনরায় পর্ণকুটিরে পৌঁছতে পেরেছিল। সে নবকুমারকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।

চ) কাপালিকের পর্ণকুটিরের যথাযথ বিবরণ দাও।
উত্তর: কাপালিকের পর্ণকুটিরটি ছিল কেয়াপাতার তৈরি । সেখানে ব্যাঘ্রচর্ম, ফলমূল, জলের কলস প্রভৃতি ছিল। কুটিরের পরিবেশ ছিল ভয়ংকর ও রহস্যময়।


জ) “কোথা যাইতেছ? যাইও না। ফিরিয়া যাও—পলায়ন কর।” — উক্তিটি কার? কে, কাকে, কখন, কেন এ উক্তি করেছিল? নবকুমার পরে কী করল?
উত্তর: উক্তিটি কপালকুণ্ডলার। কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে এই কথা বলেছিল, যখন নবকুমার কাপালিকের আশ্রম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছিল। কাপালিকের বিপদের আশঙ্কায় সে নবকুমারকে পালিয়ে যেতে বলেছিল। পরে নবকুমার তার কথা অনুযায়ী সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে।




৩) শূন্যস্থান পূরণ করো

ক) সে তো আশ্চর্যচকিত, কিন্তু — ? — সকলই করিতে পারে। তবে কি — ? পলাইব বা — ?

উত্তর:
সে তো আশ্চর্যচকিত, কিন্তু ভয় সকলই করিতে পারে। তবে কি করিব? পলাইব বা থাকিব?

খ) নবকুমার কহিলেন, “এ পর্যন্ত — দর্শনে কি জন্য — ছিলাম?” “কাপালিক কহিল — নিযুক্ত ছিলাম।”

এউত্তর:
“এ পর্যন্ত আপনার দর্শনে কি জন্য বঞ্চিত ছিলাম?” “কাপালিক কহিল — সাধনায় নিযুক্ত ছিলাম।”

গ) ভ্রমণ করিতে করিতে — শ্রম জন্মিল। — অনাহার; এজন্য — — হইলেন।
উত্তর:
ভ্রমণ করিতে করিতে তাহার শ্রম জন্মিল। সমস্ত দিন অনাহার; এজন্য অধিক অবসন্ন হইলেন।

ঘ) — হইতে জানু পর্যন্ত — আবৃত। তলদেশে — ;
উত্তর:
কটিদেশ হইতে জানু পর্যন্ত শার্দূলচর্মে আবৃত। তলদেশে রুদ্রাক্ষমালা;

ঙ) পরে — শয়ন করিলেন, সমস্ত — শীঘ্রই — হইলেন।
উত্তর:
পরে ব্যাঘ্রচর্মে শয়ন করিলেন, সমস্ত দিবসজনিত ক্লেশে শীঘ্রই নিদ্রাভিভূত হইলেন।

৪) রচনাধর্মী উত্তর

ক) “পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?” — উক্তিটির আলোকে ঘটনাটির পূর্বাপর আলোচনা করো।

Ans. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ গল্পে এই উক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রতীরে সঙ্গীদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে নবকুমার গভীর বনে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। চারদিকে অন্ধকার, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও বন্য জন্তুর ভয় তাকে অসহায় করে তোলে। সে বালিয়াড়ি ও বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে থাকে। পরে দূরে আগুনের আলো দেখে সেখানে পৌঁছে এক ভয়ংকর কাপালিককে দেখতে পায়। কাপালিক তাকে আশ্রয় ও খাদ্য দিলেও তার মনে ভয় থেকেই যায়।

পরদিন নবকুমার বন থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে সমুদ্রতীরে এসে উপস্থিত হয়। সেখানে সন্ধ্যার আবছা আলোয় সে এক অপূর্ব সুন্দরী রমণীকে দেখতে পায়। কিছুক্ষণ দুজনেই নীরবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর রমণী মধুর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে— “পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?”

এই উক্তির মাধ্যমে নবকুমারের অসহায় ও দিশেহারা অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়। একই সঙ্গে এই মুহূর্ত থেকেই কাহিনির নতুন মোড় শুরু হয়। রহস্যময়ী রমণীর আবির্ভাবে গল্পে রোমাঞ্চ ও কৌতূহল আরও বৃদ্ধি পায়। তাই উক্তিটি গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।




খ) ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ পাঠটির নামকরণ সার্থক আলোচনা করো।

Ans. ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ নামটি যথার্থ ও সার্থক। কারণ এই নামের মধ্যেই গল্পের প্রধান স্থান ও মুখ্য চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।

গল্পের প্রধান ঘটনাগুলি সমুদ্রতীরবর্তী সাগরসঙ্গম অঞ্চলে ঘটেছে। এখানেই নবকুমার সঙ্গীদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়। এই নির্জন সমুদ্রতীরেই সে ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় এবং কাপালিকের সঙ্গে পরিচিত হয়। আবার এখানেই রহস্যময়ী সুন্দরী রমণীর আবির্ভাব ঘটে। ফলে কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু হলো সাগরসঙ্গম।

অন্যদিকে নবকুমার এই গল্পের প্রধান চরিত্র। তার ভয়, দুঃখ, অসহায়তা, বিস্ময় ও মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়েই গল্প এগিয়ে চলে। পাঠক তার অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই কাহিনিকে অনুভব করে।

অতএব, স্থান হিসেবে “সাগর সঙ্গম” এবং চরিত্র হিসেবে “নবকুমার”— এই দুইয়ের সমন্বয়ে নামটি সম্পূর্ণ অর্থবহ হয়েছে। তাই বলা যায়, পাঠটির নামকরণ অত্যন্ত সার্থক।




গ) “এ যে দেবী-না মানুষ” — কাপালিকের মায়ার কথা উল্লেখ করে নবকুমারের মনোভাব ব্যক্ত করো।

Ans.সমুদ্রতীরে রহস্যময়ী রমণীকে প্রথম দেখে নবকুমার অত্যন্ত বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছিল। সন্ধ্যার আবছা আলো, সমুদ্রের গর্জন এবং রমণীর অপূর্ব সৌন্দর্য তাকে অভিভূত করে তোলে। তাই তার মনে হয়েছিল— “এ যে দেবী-না মানুষ।”

এর আগে নবকুমার কাপালিকের আশ্রমে ভয়ংকর পরিবেশ দেখেছিল। নরকপাল, অস্থি ও কাপালিকের অদ্ভুত আচরণ দেখে তার মনে ভয় ও সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল। সে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে কাপালিক তন্ত্রমন্ত্র ও মায়াবিদ্যায় পারদর্শী।

এই অবস্থায় সমুদ্রতীরে হঠাৎ অপূর্ব সুন্দরী এক রমণীকে দেখে নবকুমার বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারেনি রমণী সত্যিই মানুষ, নাকি কাপালিকের কোনো অলৌকিক মায়া। তার মনে ভয়, বিস্ময় ও আকর্ষণ একসঙ্গে কাজ করছিল।

এই উক্তির মাধ্যমে নবকুমারের সংবেদনশীল মন, সৌন্দর্যবোধ এবং আতঙ্কিত মানসিক অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়।




ঘ) “কাপালিক মনুষ্য, আমিও মানুষ” — উক্তিটির বক্তা কে? সে এরূপ বলার যথাযথ কারণ উল্লেখ করো।

Ans. উক্তিটির বক্তা হলেন কাপালিক। নবকুমার প্রথমে কাপালিককে দেখে অত্যন্ত ভয় পেয়ে যায়। কারণ কাপালিকের চেহারা, আশ্রমের পরিবেশ এবং আচরণ ছিল ভীতিকর। কিন্তু কাপালিক নবকুমারকে আশ্রয় ও খাদ্য দেয়।

কাপালিক বুঝতে পারে যে নবকুমার তাকে ভয় করছে এবং তার প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। তাই সে নবকুমারের ভয় দূর করার জন্য বলে— “কাপালিক মনুষ্য, আমিও মানুষ।”

এই কথার মাধ্যমে কাপালিক নিজেকে কোমল ও সদয় ব্যক্তি হিসেবে প্রকাশ করতে চেয়েছিল। সে নবকুমারকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিল যে তার কোনো ক্ষতি করা হবে না।

কিন্তু বাস্তবে কাপালিকের চরিত্র রহস্যময় ও ভয়ংকর ছিল। তার আশ্রমের নরকপাল, অস্থি এবং আচরণ দেখে বোঝা যায় যে তার কথার মধ্যে আন্তরিকতা কম, কপটতা বেশি ছিল। তাই এই উক্তির মধ্যে ছলনা ও ভণ্ডামির আভাস পাওয়া যায়।




ঙ) নবকুমারকে গল্পের নায়ক বলা যায় কি? নবকুমারের চরিত্রের বর্ণনা দাও।

Ans.নবকুমারকে গল্পের নায়ক বলা যায়। কারণ তিনি ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বারবার বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন।

নবকুমার ছিলেন ভদ্র, সাহসী ও সংবেদনশীল যুবক। সঙ্গীরা তাকে সমুদ্রতীরে ফেলে চলে গেলেও তিনি ধৈর্য হারাননি। ভয়ংকর পরিবেশেও তিনি আশার আলো খুঁজেছেন। কাপালিকের মতো ভীতিকর মানুষের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি আত্মসংযম বজায় রেখেছিলেন।

তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী ও সৌন্দর্যবোধসম্পন্ন। সমুদ্রের সৌন্দর্য এবং রহস্যময়ী রমণীর রূপ তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। আবার তিনি অত্যন্ত সরল ও মানবিক ছিলেন। সহজে অন্যকে বিশ্বাস করার প্রবণতাও তার চরিত্রে ছিল।

কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলায় তিনি দুঃখ, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। তার অসহায় অবস্থা পাঠকের মনে করুণা সৃষ্টি করে। এই দুঃখময় অভিজ্ঞতা ও ভাগ্যবিড়ম্বনার কারণেই নবকুমারকে গল্পের নায়ক বলা যায়।

এখানে আপনার সরবরাহ করা ছবির ব্যাকরণ ও ব্যাখ্যা অংশের সমস্ত প্রশ্নের সমাধান দেওয়া হলো। পাঠ্যবইয়ের মূল গল্পের (সাগর সঙ্গমে নবকুমার) ওপর ভিত্তি করে এগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে।

৫। ব্যাখ্যা করো

ক) “রাত্রি মধ্যে ব্যাঘ্র ভল্লুকের সাক্ষাৎ পাইবার সম্ভাবনা। প্রাণনাশই নিশ্চিত।”

Ans. উদ্ধৃত অংশটি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর বিখ্যাত উপন্যাস কপালকুণ্ডলা-র অন্তর্গত ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ পাঠ্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে।
       সমুদ্রযাত্রার শেষে সঙ্গীদের দ্বারা নির্জন ও দুর্গম এক বালিয়াড়িতে পরিত্যক্ত হয়ে তরুণ নবকুমার যখন চরম সংকটে পড়েন, তখন তাঁর এই মানসিক উপলব্ধির সৃষ্টি হয়।
            কাঠ সংগ্রহের জন্য নবকুমার যখন নৌকা থেকে নামেন, তখন জোয়ারের বেগ বা অন্য কোনো কারণে তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে না নিয়েই নৌকা ছেড়ে চলে যায়। সারা দিন অনাহারে নদীর তীরে তীরে খুঁজেও তিনি নৌকার দেখা পাননি। ধীরে ধীরে সূর্য অস্ত যায় এবং চারদিক গভীর অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। সেই জনমানবহীন প্রান্তর ও গহীন বনের মাঝে মাথার ওপর ছিল হিমবর্ষী আকাশ, আর পান করার মতো ছিল কেবল লবণাক্ত জল। এই চরম প্রতিকূল ও আশ্রয়হীন অবস্থায় বন্য হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচানো অসম্ভব মনে করে নবকুমার নিজের আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে শিউরে উঠেছিলেন।

খ) “কোথা যাইতেছ? যাইও না। ফিরিয়া যাও—পলায়ন কর।”
Ans.  উদ্ধৃত অংশটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ নামক প্রবন্ধ বা পাঠ্যাংশ থেকে গৃহীত।
           কাপালিকের আশ্রয়ে রাত কাটানোর পর, কাপালিক যখন নবকুমারকে তার সঙ্গে আসার নির্দেশ দেয় এবং নবকুমার তার পিছু পিছু চলতে শুরু করেন, তখন সেই নিবিড় কেশধারিণী বন্যদেবীমূর্তি (কপালকুণ্ডলা) আচমকা এসে তাঁকে এই সতর্কবাণী শোনায়।
              নির্জন সৈকতে পথ হারানো নবকুমারকে কাপালিক তার কুটিরে আশ্রয় দিয়েছিল এবং খাবার ও শোবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। পরদিন সন্ধ্যায় কাপালিক যখন তাঁকে এক অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন কাপালিকের অলক্ষ্যে সেই রহস্যময়ী তরুণী নবকুমারের পিছু নেয় এবং তাঁর পিঠে কোমল হাত রেখে কথা বলতে বারণ করে। তরুণী অত্যন্ত মৃদুস্বরে নবকুমারকে কাপালিকের সাথে যেতে নিষেধ করে এবং অবিলম্বে সেখান থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর পরামর্শ দেয়। এর মাধ্যমে কাপালিকের এক ভয়ানক ও গোপন নিষ্ঠুর উদ্দেশ্যের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা আগন্তুক নবকুমার জানতেন না।

গ) “কখনও উপত্যকায়, কখনও অধিত্যকায়, কখনও স্তূপতলে, কখন স্তূপশিখরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।”
Ans.  উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ নামক পাঠ্যাংশ থেকে সংকলিত।
           সঙ্গীদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে তীব্র ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও শীতের মধ্যে একাকী অন্ধকারে বালিয়াড়ির বুকে নবকুমারের দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
          রসুলপুর থেকে সুবর্ণরেখা নদী পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছোট ছোট পাহাড়ের মতো বালিয়াড়ি বা বালুকাস্তূপ ছড়িয়ে ছিল। রাতের অন্ধকারে চারদিক যখন জনশূন্য ও নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, তখন তীব্র মানসিক অস্থিরতার কারণে নবকুমার এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছিলেন না। হিংস্র পশুর আক্রমণের ভয় থাকা সত্ত্বেও তিনি অবিরত সেই বালির পাহাড়ের কখনো নিচের সমতল ভূমিতে (উপত্যকা), কখনো পাহাড়ের ওপরের সমতল অংশে (অধিত্যকা), আবার কখনো স্তূপের একদম চূড়ায় বা নিচে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে থাকেন। তাঁর এই অনবরত স্থান পরিবর্তন মূলত তাঁর ভেতরের চরম অসহায়তা ও প্রাণের ব্যাকুলতাকেই প্রকাশ করে।

ঘ) “অকস্মাৎ এইরূপ দুর্গমমধ্যে দেবী মূর্তি দেখিয়া নিস্পন্দ শরীর হইয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার বাকশক্তি রহিত হইল। স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিলেন।”
Ans.  আলোচ্য অংশটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’ পাঠ্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে।
         ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য ফল খুঁজতে গিয়ে পথ হারিয়ে নবকুমার যখন সমুদ্রতীরে এসে পৌঁছান এবং সেখানে এক অপরূপ সুন্দরী তরুণীকে দেখতে পান, তখনকার বিস্ময়াভিভূত অবস্থার বর্ণনা এটি।
          গভীর অরণ্য ও বালুকাস্তূপ পার হয়ে নবকুমার যখন সমুদ্রের তীরে এসে বসেন, তখন সন্ধ্যা নেমে আসছিল। হঠাৎ তিনি পেছনে ফিরে দেখতে পান আগুল্ফলম্বিত ঘন কৃষ্ণ কেশরাশি পরিবৃত এক অপূর্ব নারীমূর্তি স্নিগ্ধ-গম্ভীর দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে। ওই জনমানবহীন, ভয়ংকর সুন্দর সমুদ্র সৈকতে কোনো অলংকার ছাড়াই সেই তরুণীর রূপের এক অলৌকিক বা মোহিনী শক্তি ছিল, যা নবকুমারকে সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ করে দেয়। প্রকৃতির এই আদিম রূপের মাঝে এমন এক অলৌকিক মানবীকে দেখে তিনি এতটাই চমকে যান যে জড়বস্তুর মতো স্তব্ধ হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন।

৬। ব্যাকরণ

ক) নিজে করো — সন্ধিবিচ্ছেদ:

মৃন্ময় — মৃৎ + ময় (ব্যঞ্জনসন্ধি)

নিরীক্ষণ — নিঃ + ঈক্ষণ (বিসর্গ সন্ধি)

পর্য্যন্ত — পরি + অন্ত (স্বরসন্ধি)

ইতস্তত — ইতস্ততঃ (শব্দটি নিজেই বিসর্গান্ত রূপ, তবে বিচ্ছেদ করলে হয়: ইতঃ + ততঃ) [বিসর্গ সন্ধি]

নীরব — নিঃ + রব (বিসর্গ সন্ধি)

সময়ান্তরে — সময় + অন্তরে (স্বরসন্ধি)

সদুপায় — সৎ + উপায় (ব্যঞ্জনসন্ধি)


খ) ব্যাসবাক্য সহ সমাসের নাম লেখো:

পর্ণকুটির: পর্ণ (পাতা) দ্বারা নির্মিত কুটির = মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস

দেহরত্ন: দেহ রূপ রত্ন = রূপক কর্মধারয় সমাস

পথভ্রান্তি: পথে ভ্রান্তি = ৭মী তৎপুরুষ সমাস (অথবা: পথ হইতে ভ্রান্তি = ৫মী তৎপুরুষ)

অনুচিত: নয় উচিত = নঞ তৎপুরুষ সমাস

কণ্ঠাগত: কণ্ঠে আগত = ৭মী তৎপুরুষ সমাস

কার্পাসবস্ত্র: কার্পাস নির্মিত বস্ত্র = মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস

শিখরাসীন: শিখরে আসীন = ৭মী তৎপুরুষ সমাস

তন্দ্রাভিভূত: তন্দ্রা দ্বারা অভিভূত = ৩য়া তৎপুরুষ সমাস

কাষ্ঠভার: কাষ্ঠের ভার = ৬ষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস


গ) বাক্যরচনা করো (বিশিষ্ট অর্থে / বাগধারা):

আকাশকুসুম (অসম্ভব কল্পনা): অলস বসে বসে আকাশকুসুম চিন্তা না করে পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা শুরু করো।

আক্কেল সেলামি (বোকামির দণ্ড): বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ করতে গিয়ে আজ মোটা টাকা আক্কেল সেলামি দিতে হলো।

আদাজল খেয়ে (প্রাণপণ চেষ্টা করা): এবার পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্য রোহিত আদাজল খেয়ে লেগেছে।

আঁতে ঘা (মনে কষ্ট দেওয়া): তার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় লোকটার একদম আঁতে ঘা লেগেছে।

কেঁচো খুঁড়তে কেউটে (সামান্য ঘটনা থেকে বিরাট রহস্য বের হওয়া): সামান্য চুরির তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ এখন কেঁচো খুঁড়তে কেউটে সাপ বের করে ফেলল।

কূপমণ্ডূক (সংকীর্ণমনা বা ঘরকুনো): সারা জীবন নিজের গ্রামে কাটিয়ে সুমেশ বাবু একজন কূপমণ্ডূক ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।

চিনির বলদ (যে কেবল ভার বহন করে, ফলের ভাগ পায় না): দিনরাত খাটলেও কোম্পানির লাভের অংশ অংশীদারেরাই পায়, সুব্রত বাবু সেখানে কেবলই চিনির বলদ।

টনক নড়া (চৈতন্যোদয় হওয়া বা চেতনা ফেরা): চূড়ান্ত পরীক্ষায় ফেল করার পর অলস ছেলেটির অবশেষে টনক নড়েছে।

ধর্মের ষাঁড় (স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি): পাড়ার নেতার প্রশ্রয় পেয়ে ছেলেটি একদম ধর্মের ষাঁড় হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কাউকে পরোয়া করে না।

পায়াভারি (অহংকার হওয়া): বড় চাকরিটা পাওয়ার পর থেকেই রমেনের কেমন যেন পায়াভারি হয়েছে, চেনা মানুষকেও চেনে না।


ঘ) সন্ধি ও সমাসের মধ্যে পাঁচটি পার্থক্য নিরূপণ করো:

১। সন্ধি হলো দুটি ধ্বনি বা বর্ণের মিলন।
সমাস হলো দুই বা ততোধিক পদের মিলন।

২। সন্ধির মূল উদ্দেশ্য হলো উচ্চারণের সহজতা ও শ্রুতিমাধুর্য রক্ষা করা।
সমাসের মূল উদ্দেশ্য হলো বাক্যকে সংক্ষেপ করা ও নতুন শব্দ গঠন করা।

৩। সন্ধিতে বিভক্তি লোপ পাওয়ার কোনো নিয়ম বা সুযোগ থাকে না।
সমাসে (বিশেষ করে তৎপুরুষে) অনেক সময় ব্যাসবাক্যের বিভক্তি লোপ পায়।

৪। সন্ধির ক্ষেত্রে পদের ক্রম বা বিন্যাস পরিবর্তিত হয় না।
সমাসের ক্ষেত্রে পদগুলোর অবস্থান ও অর্থের প্রাধান্য অনুযায়ী বিন্যাস বদলে যেতে পারে।

৫। সন্ধি প্রধানত তিন প্রকার: স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি।
সমাস প্রধানত ছয় প্রকার: দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব।


ঙ) অর্থানুসারে বাক্য রচনা করো:

অস্ত্যর্থক বাক্য (হ্যাঁ-বাচক বাক্য):
বাক্য: সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়।

নস্ত্যর্থক বাক্য (না-বাচক বাক্য):
বাক্য: অসৎ মানুষকে কেউ কখনো বিশ্বাস করে না।

প্রশ্নাত্মক বাক্য (প্রশ্নবাচক বাক্য):
বাক্য: তুমি কি আজ বিকেলের ট্রেনে কলকাতা যাচ্ছ?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *