“নানা প্রকার সরকার বা সরকারের শ্রেণিবিভাগ”

দ্বিতীয় অধ্যায়: নানা প্রকার সরকার বা সরকারের শ্রেণিবিভাগ

অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও :

১. সরকারের শ্রেণি বিভাজন-কারী প্রথম রাজনৈতিক দার্শনিক কে?

উত্তর: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো সরকারের শ্রেণি বিভাজনের সূচনা করেছিলেন।

২. বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সরকার কোনটি?

উত্তর: বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সমাদৃত শাসন ব্যবস্থা হলো সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ।

৩. সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের প্রচলন আছে এমন একটি রাষ্ট্রের নাম বলো ?

উত্তর: ইংল্যান্ড বা ভারতে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের প্রচলন আছে ।

৪. সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান কে ?

উত্তর: এই সরকারে প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রকৃত কার্যপালিকা বা সরকার প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি (বা রাজা/রানি) হলেন নামমাত্র কার্যপালিকা বা রাষ্ট্রপ্রধান ।

৫. ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি কোন প্রকারের সরকারে থাকে?

উত্তর: রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকারে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি স্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকে।

৬. রাষ্ট্রপতি-প্রধান সরকার আছে এমন একটি রাষ্ট্রের নাম লেখো।

উত্তর: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি-প্রধান বা রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার আছে ।

৭. এককেন্দ্রীয় সরকার প্রচলিত আছে, এমন একটি রাষ্ট্রের নাম বলো।

উত্তর: ব্রিটেন (ইংল্যান্ড), ফ্রান্স বা জাপানে এককেন্দ্রীয় সরকার প্রচলিত আছে।

৮. যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারে যে দু-রকম সরকার থাকে তাদের নাম বলো।

উত্তর: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারে কেন্দ্রীয় সরকার এবং অঙ্গরাজ্য বা রাজ্য সরকার—এই দুই ধরনের সরকার থাকে।

৯. স্যুইজারল্যান্ডে কোন পদ্ধতির সরকার আছে?

উত্তর: স্যুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতির সরকার সফলতার সঙ্গে কার্যকর আছে ।

১০. ভারতবর্ষে দ্বৈত-নাগরিকত্বের ব্যবস্থা আছে কি?

উত্তর: না, ভারতবর্ষে একক নাগরিকত্বের ব্যবস্থা আছে। দ্বৈত-নাগরিকত্বের ব্যবস্থা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে দেখা যায় ।

সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও :

১. বর্তমান কালে প্রচলিত বিশ্বের বিভিন্ন প্রকার সরকার কী কী?

উত্তর: আধুনিক যুগে জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিগুলোকে মূলত চার ভাগে ভাগ করা হয়: এককেন্দ্রীয় সরকার, যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার এবং রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার ।

২. সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: সংসদীয় সরকারের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:

ক) এতে দুইজন প্রধান থাকেন—একজন প্রকৃত কার্যপালিকা (প্রধানমন্ত্রী) এবং অন্যজন নামমাত্র প্রধান (রাষ্ট্রপতি বা রাজা)।

খ) এই শাসন ব্যবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ তাদের কাজের জন্য বিধানমণ্ডলের কাছে দায়বদ্ধ থাকে।

৩. সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের দুটি দোষ এবং দুটি গুণের উল্লেখ করো।

উত্তর:
গুণ: ১. কার্যপালিকা ও বিধানমণ্ডলের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সহযোগিতা থাকে। ২. সরকার দায়বদ্ধ থাকায় স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না।

দোষ: ১. কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে গঠিত ‘মোর্চা সরকার’ অস্থায়ী ও দুর্বল হয়। ২. মন্ত্রীরা প্রায়ই অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে আমলাদের ওপর অত্যধিক নির্ভর করতে হয়।

৪. ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি বলতে কী বোঝো?

উত্তর: ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সরকারের তিনটি প্রধান অঙ্গ—কার্যপালিকা, বিধানমণ্ডল ও ন্যায়পালিকা নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং কেউ কারো ওপর হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ করে না। এটি মূলত রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকারের প্রধান ভিত্তি।

৫. রাষ্ট্রপতি-প্রধান সরকারের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: রাষ্ট্রপতি-প্রধান সরকারের দুটি বৈশিষ্ট্য হলো:

ক) রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; রাষ্ট্রপতিই উভয় পদের অধিকারী।

খ) রাষ্ট্রপতি ও বিধানমণ্ডল একটি নির্দিষ্ট কার্যকালের জন্য নির্বাচিত হন এবং সহজে পদচ্যুত হন না।

৬. এক-কেন্দ্রীয় সরকারের দুটি দোষ ও দুটি গুণের উল্লেখ করো।

উত্তর:
গুণ: ১. সমগ্র দেশে একই প্রশাসন থাকায় ব্যবস্থা শক্তিশালী ও সহজ হয়। ২. সরকার পরিচালনার ব্যয় অনেক কম।

দোষ: ১. বিশাল আয়তনের রাষ্ট্রের পক্ষে এই সরকার উপযোগী নয়। ২. স্থানীয় বা আঞ্চলিক সমস্যাগুলো অনেক সময় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে গুরুত্ব পায় না।

দীর্ঘ উত্তর লেখো:

১. রাষ্ট্রপতি-প্রধান সরকারের দোষ-গুণ নিয়ে একটি আলোচনা প্রস্তুত করো।

উত্তর: রাষ্ট্রপতি-প্রধান সরকারের প্রধান গুণ হলো এর স্থায়িত্ব; রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট সময়ের আগে সহজে পদচ্যুত হন না বলে দেশ শক্তিশালী নেতৃত্বের অধীনে থাকে । ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির ফলে প্রতিটি অঙ্গ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায় এবং জরুরিকালীন অবস্থায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় ।
তবে এর কিছু দোষও আছে। যেহেতু রাষ্ট্রপতি বিধানমণ্ডলের কাছে দায়বদ্ধ নন, তাই এই সরকার স্বেচ্ছাচারী হওয়ার আশঙ্কা থাকে。 কার্যপালিকা ও বিধানমণ্ডলের মধ্যে প্রায়ই সহযোগিতার অভাব দেখা দেয়, যা জাতীয় প্রশাসনে বিরূপ প্রভাব ফেলে । এছাড়া সংবিধান অনমনীয় হওয়ায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা সংশোধন করা বেশ জটিল হয়ে ওঠে।

২. সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের বৈশিষ্ট্যগুলো লেখো।

উত্তর: সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

দ্বৈত শাসন: এখানে একজন নামমাত্র প্রধান (রাষ্ট্রপতি বা রাজা) এবং একজন প্রকৃত প্রধান (প্রধানমন্ত্রী) থাকেন।

নিবিড় সম্পর্ক: কার্যপালিকা বা মন্ত্রিপরিষদের সদস্যগণ সরাসরি বিধানমণ্ডলেরও সদস্য হন।

দায়বদ্ধতা: মন্ত্রিপরিষদ তাদের সকল কাজের জন্য বিধানমণ্ডলের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। বিধানমণ্ডল অনাস্থা প্রস্তাব আনলে সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়।

সামগ্রিক দায়বদ্ধতা: মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্যের ব্যর্থতার দায় পুরো পরিষদকে নিতে হয়।

জনমতের গুরুত্ব: বিরোধী দলের সমালোচনা ও পরবর্তী নির্বাচনের ভয়ে এই সরকার জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে।

৩. যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতির সরকার বর্তমানে কেন জনপ্রিয় হয়েছে, আলোচনা করো।

উত্তর: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার বর্তমানে তার অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য জনপ্রিয় । এটি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয় একতা—দুটোরই সুবিধা প্রদান করে । বিশেষ করে ভারত বা আমেরিকার মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে, যেখানে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও ভাষার মানুষ বাস করে, সেখানে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত ফলপ্রসূ । ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ থাকায় কেন্দ্র স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না এবং সাধারণ মানুষ শাসনের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়, যা গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় করে。 যদিও কেন্দ্র-রাজ্য বিরোধের মতো কিছু জটিলতা থাকে, তবুও আধুনিক বৈচিত্র্যময় বিশ্বে এটি একটি সফল শাসন পদ্ধতি।

৪. এক-কেন্দ্রীয় সরকারের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করো।

উত্তর: এককেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ: সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতা একটি মাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে।

একক নাগরিকত্ব: এখানে জনগণের জন্য কেবল একটি জাতীয় নাগরিকত্বের ব্যবস্থা থাকে।

সংবিধানের প্রকৃতি: এর সংবিধান লিখিত (যেমন নেদারল্যান্ড) বা অলিখিত (যেমন ইংল্যান্ড) দুই প্রকারেরই হতে পারে।
আইনসভার প্রাধান্য: আইনসভা প্রণীত আইন সমগ্র দেশের জন্য প্রযোজ্য হয় এবং ন্যায়পালিকা একে অসাংবিধানিক বলে সহজে ঘোষণা করতে পারে না।

নমনীয়তা: পরিবেশ ও পরিস্থিতি সাপেক্ষে এর সংবিধান সহজেই সংশোধনযোগ্য।

৫. এক-কেন্দ্রীয় সরকার কি প্রকৃতই গণতান্ত্রিক? সমালোচনামূলক যুক্তি দর্শাও।

উত্তর: এককেন্দ্রীয় সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। একদিকে এটি শক্তিশালী ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং সমগ্র দেশে একই ধরনের আইন প্রয়োগ করে সাম্য বজায় রাখে । কিন্তু সমালোচনামূলক দিক থেকে দেখলে দেখা যায়, এই সরকারে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অনেক কম থাকে, কারণ ক্ষমতা এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে। এটি সুবৃহৎ রাষ্ট্রের আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে অবজ্ঞা করে এবং অনেক সময় অত্যধিক আমলাতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। যেহেতু ক্ষমতা বণ্টনের ব্যবস্থা নেই, তাই এটি যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের মতো তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রকে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়। সুতরাং, এটি গণতান্ত্রিক কাঠামো হলেও এর প্রয়োগ প্রায়ই নিরঙ্কুশ শাসনের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা রাখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *