আন্তর্জাতিক সংস্থা : রাষ্ট্রসঙ্ঘ এবং অন্যান্য
আন্তর্জাতিক সংস্থা : রাষ্ট্রসঙ্ঘ এবং অন্যান্য
—
অনুশীলনী (Anushiloni) – প্রশ্নোত্তর (Questions and Answers)
অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও (Answer very briefly)
১। রাষ্ট্রসংঘ কেন গঠিত হয়েছিল?
উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯) ভয়াবহ ধ্বংসলীলার পর আরও একবার বিশ্ববাসীকে ভয়ার্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাষ্ট্রসংঘ গঠিত হয়েছিল।
২। রাষ্ট্রসংঘের দুটি উদ্দেশ্য উল্লেখ করো।
উত্তর: রাষ্ট্রসংঘের দুটি উদ্দেশ্য হলো — আন্তঃরাষ্ট্রীয় শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং সমান অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা।
৩। রাষ্ট্রসংঘের অঙ্গ কয়টির নাম লেখো।
উত্তর: রাষ্ট্রসংঘের ছয়টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি প্রধান অঙ্গ হলো সাধারণ সভা (General Assembly), নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council) এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (Economic and Social Council)।
৪। রাষ্ট্রসংঘের সঙ্গে জড়িত দুটি এজেন্সির নাম লেখো।
উত্তর: রাষ্ট্রসংঘের সঙ্গে জড়িত দুটি এজেন্সি হলো আন্তঃরাষ্ট্রীয় শ্রমিক সংঘ (International Labour Organisation – ILO) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organisation – WHO)।
৫। নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত দুটি চুক্তির নাম লেখো।
উত্তর: নিরস্ত্রীকরণের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত দুটি চুক্তি হলো ১৯৬৩ সালের আংশিকভাবে আণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ চুক্তি (Partial Nuclear Test Ban Treaty) এবং ১৯৯৬ সালের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (Comprehensive Test Ban Treaty – CTBT)।
৬। মানব অধিকার মানে কী?
উত্তর: মানব অধিকার বলতে বিশ্বের প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সেই অধিকারগুলোকে বোঝায়, যা রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় গৃহীত মানব অধিকার ঘোষণাপত্রে সন্নিবিষ্ট এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলো দ্বারা স্বীকৃত।
—
দীর্ঘ উত্তরধর্মী প্রশ্ন (Long Answer Type Questions)
১। রাষ্ট্রসংঘ গঠনের উদ্দেশ্য এবং এর নীতিগুলি আলোচনা করো।
উত্তর:
রাষ্ট্রসংঘের সনদের প্রথম অনুচ্ছেদে চারটি প্রধান উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়েছে। প্রথমত, আন্তঃরাষ্ট্রীয় শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত, সমান অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা সমাধান করা এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যাতে মানব ও মৌলিক অধিকার উপভোগ করতে পারে তার ব্যবস্থা করা। চতুর্থত, এই সমস্ত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের একটি কেন্দ্র হিসেবে রাষ্ট্রসংঘ কাজ করবে।
রাষ্ট্রসংঘের নীতিগুলিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বলা হয়েছে যে সব সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বভৌম সমতা থাকবে। প্রত্যেক রাষ্ট্র সংবিধান বা সনদে বর্ণিত নিয়ম মেনে চলবে। সকল রাষ্ট্রকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিবাদ শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করতে হবে যাতে বিশ্বশান্তিতে কোনো আঘাত না আসে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ করা নিষিদ্ধ। রাষ্ট্রসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে হবে এবং রাষ্ট্রসংঘের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রকে কেউ সাহায্য করতে পারবে না। সর্বশেষে, রাষ্ট্রসংঘ কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
—
২। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওপর একটি টীকা লেখো।
উত্তর:
নিরাপত্তা পরিষদ হলো রাষ্ট্রসংঘের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যার মূল দায়িত্ব আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। প্রাথমিকভাবে পরিষদে ছিল পাঁচজন স্থায়ী সদস্য এবং ছয়জন অস্থায়ী সদস্য। ১৯৬৩ সালে সনদ সংশোধনের পর অস্থায়ী সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দশ, ফলে মোট সদস্য সংখ্যা হয় পনেরো।
স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলি হলো—আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং চীন। অস্থায়ী সদস্যদের দুই বছরের জন্য সাধারণ সভা কর্তৃক নির্বাচিত করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্তত নয়জন সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন, যার মধ্যে স্থায়ী পাঁচজন সদস্যের উপস্থিতি আবশ্যক। স্থায়ী সদস্যদের ‘ভেটো’ (Veto) প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। কোনো বিষয়ে স্থায়ী সদস্য ভেটো প্রয়োগ করলে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায় না। এই কারণে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যক্রমে স্থায়ী সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
—
৩। বিশ্বশান্তির জন্য রাষ্ট্রসংঘ দ্বারা গৃহীত পদক্ষেপসমূহ আলোচনা করো।
উত্তর:
রাষ্ট্রসংঘের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করা। এই লক্ষ্য পূরণে রাষ্ট্রসংঘ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
প্রথমত, নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে যুদ্ধের সম্ভাবনা হ্রাস করার জন্য রাষ্ট্রসংঘ উদ্যোগ নেয় এবং ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে একটি নিরস্ত্রীকরণ আয়োগ গঠন করে।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রসংঘের প্রচেষ্টায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদিত হয় যেমন ১৯৬৩ সালের আংশিকভাবে আণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ চুক্তি, ১৯৬৮ সালের পারমাণবিক অস্ত্র সংকোচন চুক্তি এবং ১৯৯৬ সালের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (CTBT)।
তৃতীয়ত, বিবাদ মীমাংসা এবং প্রতিরোধমূলক কূটনীতি গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রসংঘ শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অবশেষে, রাষ্ট্রসংঘ সর্বদা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিবাদ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে।
—
৪। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় মানব অধিকার আয়োগ সম্পর্কে একটি টীকা লেখো।
উত্তর:
বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের সুরক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্রসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভারত ১৯৯৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মানব অধিকার আয়োগ গঠন করে। পরবর্তীতে এটি সংসদে পাস হয়ে ১৯৯৪ সালের ৮ জানুয়ারি ‘মানব অধিকার সুরক্ষা আইন, ১৯৯৩’ নামে কার্যকর হয়।
এই আয়োগের সদস্যদের রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য নিযুক্ত করেন। সভাপতি হন ভারতের উচ্চতম ন্যায়ালয়ের প্রাক্তন মুখ্য ন্যায়াধীশ। অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন উচ্চতম বা উচ্চ ন্যায়ালয়ের বর্তমান বা প্রাক্তন ন্যায়াধীশ এবং মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ দুজন ব্যক্তি।
এছাড়া পদাধিকারবলে রাষ্ট্রীয় সংখ্যালঘু, অনুসূচিত জাতি ও জনজাতি, এবং মহিলা আয়োগের সভাপতিরাও এই আয়োগের সদস্য হন।
এই আয়োগের প্রধান কাজ হলো মানব অধিকার লঙ্ঘনের সমস্ত অভিযোগ পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা এবং মানবাধিকারের রক্ষায় সতর্ক প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। পরবর্তীকালে রাজ্য স্তরেও মানবাধিকার আয়োগ গঠিত হয়।
—
৫। মানব অধিকার সম্পর্কে রাষ্ট্রসংঘ যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা আলোচনা করো।
উত্তর:
রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকারের সুরক্ষায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৯৪৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রসংঘ মানব অধিকার আয়োগ (UNHRC) গঠন করে, যার কাজ ছিল মানবাধিকারের লঙ্ঘন সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ করা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া।
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ৪৮টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনে মানব অধিকার ঘোষণাপত্র (Universal Declaration of Human Rights) গৃহীত হয়, যাতে একটি প্রস্তাবনা ও ৩০টি অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই দিনটিকে ‘মানব অধিকার দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
রাষ্ট্রসংঘ এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এই অধিকারগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করে, কারণ কোনো রাষ্ট্র নাগরিকদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করলে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা করা অসম্ভব।
পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের জুন মাসে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে রাষ্ট্রসংঘ প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রে একটি মানবাধিকার আয়োগ গঠনের ওপর জোর দেয়, যার ফলস্বরূপ বহু দেশে জাতীয় মানবাধিকার আয়োগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
—
