মধ্য যুগের অসম, এই পাঠের ভিতরের এবং অনুশীলনীর প্রশ্নোত্তর
এখানে মধ্য যুগের অসম এর প্রশ্ন ও তার উত্তর প্রদান করা হলো।
ক্রিয়াকলাপ (পৃষ্ঠা ২১)
• পাঠে উল্লিখিত ‘ত্রয়োদশ শতকের অসম’ এর মানচিত্রটিতে অসমের চার সীমার রাজ্যগুলো তালিকাভুক্ত করো।
উত্তর: ‘ত্রয়োদশ শতকের অসম’-এর মানচিত্র অনুযায়ী অসমের চারপাশের সীমা নিম্নরূপ:
* উত্তরে: হিমালয় পর্বত, চীন দেশ, ভূটান এবং অকা, দফলা, মিরি, আবর প্রভৃতি জনজাতির অঞ্চল।
* পূর্বে: মিসিমি, সিংফৌ, নাগা রাজ্য এবং ব্রহ্মদেশ।
* দক্ষিণে: নাগা পাহাড়, মণিপুর, লুসাই পাহাড়, ত্রিপুরা এবং খাসিয়া-জয়ন্তিয়া রাজ্য।
* পশ্চিমে: করতোয়া নদী, ময়মনসিংহ, ঢাকা এবং গারো পাহাড়।
উত্তর লেখো (পৃষ্ঠা ২২)
• অসমে আহোম রাজ্য কে স্থাপন করেছিলেন? তাঁরা অসমে কত বছর রাজত্ব করেছিলেন?
উত্তর: অসমে আহোম রাজ্য স্থাপন করেছিলেন চাওলুং চুকাফা। তাঁরা অসমে ৬০০ বছর রাজত্ব করেছিলেন।
• কোন আহোম স্বৰ্গদেউ এর সময় থেকে আহোম শাসন ব্যবস্থায় হিন্দু ধর্মের প্রভাব পড়ে?
উত্তর: আহোম স্বর্গদেউ চুডাংফা বা বামুনি কোঁয়রের সময় থেকে আহোম শাসনে হিন্দু ধর্মের প্রভাব পড়ে।
• চুহুংমুং বা দিহিঙ্গিয়া রাজার রাজত্বকালে সৃষ্ট পদবিটির নাম কী ছিল?
উত্তর: চুহুংমুং বা দিহিঙ্গিয়া রাজার রাজত্বকালে সৃষ্ট পদবিটির নাম ছিল বরপাত্র গোহাঁই।
ক্রিয়াকলাপ (পৃষ্ঠা ২৩)
• আহোম রাজত্বকালের সংকটকাল হিসেবে কোন সময়কে বলা হয়েছে? কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে আহোম রাজত্বকালের সংকটকাল বলা হয়েছে। এই সময়টিকে “বিপ্লবের যুগ” বলা হয়। এর কারণ হলো, এই সময়ে আহোম স্বর্গদেউদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতালোভী ও স্বার্থপর উচ্চ পদাধিকারীরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, যার ফলে আহোম রাজ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছিল।
• গদাধর সিংহ আহোম রাজ্যে কীভাবে শান্তি স্থাপন করেছিলেন?
উত্তর: ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দে গদাধর সিংহ সমস্ত ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবকে প্রতিহত করে আহোম সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং রাজ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। তিনি ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে ইটাখুলির যুদ্ধে মোগলদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধের পর মানস নদী আহোম রাজ্যের পশ্চিম সীমা হিসেবে নির্ধারিত হয়, যা রাজ্যকে বাইরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত করে এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
ক্রিয়াকলাপ (পৃষ্ঠা ২৬)
• কে কার সমসাময়িক ছিলেন লেখো-
চণ্ডীবর ভূঞা, নরনারায়ণ, ইখতিয়ার উদ্দিন মালিক উজবেক তুঘ্রিল খাঁ, দুলর্ভ নারায়ণ, গোঁহাই কমল, সন্ধ্যা।
উত্তর:
* চণ্ডীবর ভূঞা ছিলেন কামতা রাজ্যের রাজা দুর্লভনারায়ণের সমসাময়িক।
* বঙ্গের সুবেদার ইখতিয়ার উদ্দিন মালিক উজবেক তুঘ্রিল খাঁ কামরূপের রাজা সন্ধ্যার রাজত্বকালে আক্রমণ করেছিলেন।
* গোঁহাই কমল ছিলেন তাঁর ভাই কোচ রাজা নরনারায়ণের সমসাময়িক।
অনুশীলনী (পৃষ্ঠা ২৭-২৮)
১। উত্তর লেখো-
(ক) কোন শতকে আহোমরা অসমে এসেছিলেন?
উত্তর: আহোমরা ত্রয়োদশ শতকে (১২২৮ খ্রিস্টাব্দে) অসমে এসেছিলেন।
(খ) চাওলুং চুকাফা অসমে আসার সময় কোন দুজন মন্ত্রীকে সঙ্গে এনেছিলেন?
উত্তর: চাওলুং চুকাফা অসমে আসার সময় বরগোঁহাই এবং বুড়াগোঁহাই নামে দুজন মন্ত্রীকে সঙ্গে এনেছিলেন।
(গ) মূলাগাভরু কে ছিলেন?
উত্তর: মূলাগাভরু ছিলেন ফ্রাচেংমুং বরগোঁহাইয়ের পত্নী। তিনি স্বামী হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তুর্বকের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।
(ঘ) কত খ্রিস্টাব্দে গদাধর সিংহ আহোম সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন?
উত্তর: ১৬৮১ খ্রিস্টাব্দে গদাধর সিংহ আহোম সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
(ঙ) কোচ রাজা নরনারায়ণ কত খ্রিস্টাব্দে আহোম রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন?
উত্তর: কোচ রাজা নরনারায়ণ ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে আহোম রাজ্য আক্রমণ করেছিলেন।
(চ) চুতিয়াদের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?
উত্তর: চুতিয়াদের সবচেয়ে শক্তিশালী বা শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন রত্নধ্বজপাল বা গৌরীনারায়ণ।
২। ক্রমানুসারে সাজাও-
উত্তর: ঘটনাগুলো তাদের সময়কাল অনুযায়ী সাজালে যা পাওয়া যায়:
* (ঙ) স্বর্গদেউ চুকাফার চরাইদেউতে রাজধানী স্থাপন (১২৫৩ খ্রিস্টাব্দ)
* (চ) ইখতিয়ার উদ্দিন মালিক উজবেগ তুঘ্রিল খাঁর কামরূপ আক্রমণ (১২৫৭ খ্রিস্টাব্দ)
* (খ) হুসেন শাহের কামরূপ কামতা আক্রমণ (১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দ)
* (ঘ) মিরজুমলার অসম আক্রমণ (১৬৬২ খ্রিস্টাব্দ)
* (গ) শরাইঘাটের যুদ্ধ (১৬৭১ খ্রিস্টাব্দ)
* (ক) ইয়ান্ডাবু সন্ধি (১৮২৬ খ্রিস্টাব্দ)
৩। শুদ্ধ/অশুদ্ধ নির্ণয় করো-
(ক) আহোমদের অসম আগমনের পর থেকে ইয়ান্ডাবু সন্ধি পর্যন্ত সময়টিই অসম বুরঞ্জীর মধ্যযুগ। – শুদ্ধ
(খ) চূডাংফা বা বামুনি কোঁয়রের সময় থেকেই আহোম স্বৰ্গদেউগণ হিন্দু নাম গ্রহণ করেছিলেন। – অশুদ্ধ (হিন্দু ধর্মের প্রভাব পড়েছিল, কিন্তু হিন্দু নাম গ্রহণ শুরু হয় স্বর্গদেউ চুহুংমুঙের সময় থেকে)।
(গ) মিরজুমলার অসম আক্রমণের সময়ে লেখক সিহাবুদ্দিন তালিস অসমে এসেছিলেন। – শুদ্ধ
(ঘ) কছাড়ি রাজা গোবিন্দচন্দ্রের রাজত্বকালে কছাড়ি রাজ্য ইংরেজদের অধীনস্থ হয়। – অশুদ্ধ (তাঁর মৃত্যুর পর রাজ্যটি ইংরেজদের অন্তর্ভুক্ত হয়)।
(ঙ) চুতিয়াগণ বৈষ্ণবধর্মী ছিলেন। – অশুদ্ধ (তাঁরা শক্তির উপাসক ছিলেন)।
(চ) কামরূপ আক্রমণের সময়ে তুর্কি-আফগানদেরকে ভূঞাগণ সাহায্য করেছিলেন। – অশুদ্ধ (তাঁরা কামরূপের রাজাকে সাহায্য করেছিলেন)।
৪। শূন্যস্থান পূর্ণ করো-
(ক) আহোমদের অসমে আগমনের পর থেকেই কামরূপ রাজ্যটি অসম নামে পরিচিত হয়।
(খ) আহোমগণ সোমদেউ নামক দেবতার পূজার্চনা করতেন।
(গ) স্বৰ্গদেউ চুহুংমুং বা দিহিঙ্গিয়া রাজার হিন্দু নাম স্বর্গ নারায়ণ।
(ঘ) সন্ধ্যা কামরূপের রাজধানী উত্তর গুয়াহাটি থেকে কামতাপুরেতে স্থানান্তরিত করেন।
(ঙ) চুতিয়াদের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা ছিলেন রত্নধ্বজপাল বা গৌরীনারায়ণ।
(চ) ভূঞা শব্দটির অর্থ হল মাটি বা ভূমির মালিক।
৫। উত্তর লেখো:
(ক) কে, কখন, অসমে আহোম রাজ্য স্থাপন করেছিলেন?
উত্তর: চাওলুং চুকাফা অসমে আহোম রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। তিনি ১২২৮ খ্রিস্টাব্দে অসমে প্রবেশ করেন এবং ১২৫৩ খ্রিস্টাব্দে চরাইদেউতে রাজধানী স্থাপন করে রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।
(খ) শরাইঘাটের যুদ্ধ কাদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল? এর ফলাফল কী হয়েছিল?
উত্তর: শরাইঘাটের যুদ্ধ আহোম এবং মোগলদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল [cite: 293-295]। এর ফলাফল ছিল আহোমদের বিজয়। [cite_start]লাচিত বরফুকনের নেতৃত্বে আহোম সেনাবাহিনী মোগল সেনাপতি রামসিংহকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে এবং অসমের গৌরব পুনরুদ্ধার করে।
(গ) বীর চিলারায় কে ছিলেন? তিনি কোন কোন রাজ্য জয় করেছিলেন?
উত্তর: বীর চিলারায় ছিলেন কোচ রাজা নরনারায়ণের ভাই এবং তাঁর সুদক্ষ সেনাপতি। তাঁর আসল নাম ছিল শুক্লধ্বজ। তিনি আহোম রাজ্য, কছাড়ি রাজ্য, মণিপুর, জয়ন্তিয়া, ত্রিপুরা, শ্রীহট্ট ইত্যাদি রাজ্য জয় করেছিলেন।
(ঘ) বারোভূঞাগণ কারা ছিলেন?
উত্তর: ‘ভূঞা’ শব্দের অর্থ ভূমির মালিক। কামরূপ রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে যে শক্তিশালী সামন্ত শাসকরা স্বাধীনভাবে ছোট ছোট অঞ্চল শাসন করতেন, তাঁরাই ভূঞা নামে পরিচিত হন। অসমে তাঁরা বারোভূঞা নামে পরিচিত ছিলেন। মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শঙ্করদেবও ভূঞা বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
(ঙ) কছাড়ি কারা ছিলেন?
উত্তর: কছাড়িগণ অসমের অতি প্রাচীন অধিবাসী। বড়ো, ডিমাসা, গারো, রাভা, সনোয়াল প্রভৃতি জনজাতিগুলো বৃহত্তর কছাড়ি গোষ্ঠীরই অংশ। আহোমদের আগমনের সময় তাঁরা ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পারে দিখৌ নদী থেকে কলং নদী পর্যন্ত এক বিশাল ও শক্তিশালী রাজ্য শাসন করতেন।
৬। পাঠে থাকা মানচিত্র দুটির একটি তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করো।
উত্তর: পাঠে থাকা ত্রয়োদশ এবং ষোড়শ শতকের মানচিত্র দুটি অসমের রাজনৈতিক বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে।
* ত্রয়োদশ শতকের মানচিত্র: এই মানচিত্রে অসমকে একটি খণ্ডিত রাজনৈতিক অঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়েছে। পশ্চিমে কামতাপুর রাজ্য, পূর্বে চুতিয়া ও কছাড়ি রাজ্য এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ছোট ছোট ভূঞাদের শাসন ছিল। আহোমদের উপস্থিতি তখন সবেমাত্র পূর্বদিকে শুরু হয়েছে।
* ষোড়শ শতকের মানচিত্র: এই মানচিত্রে অসমের রাজনৈতিক চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোট ছোট রাজ্যগুলোর পরিবর্তে দুটি প্রধান শক্তির উত্থান দেখা যায়—পশ্চিমে কোচ রাজ্য এবং পূর্বে আहोम রাজ্য। এই সময়ের মধ্যে কামতাপুর রাজ্যের জায়গায় কোচ রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং চুতিয়া রাজ্য আহোমদের অধীনে চলে গেছে।
তুলনা: ত্রয়োদশ শতকের খণ্ডিত ও দুর্বল রাজ্যগুলোর পতন ঘটে এবং ষোড়শ শতকের মধ্যে দুটি বৃহৎ ও কেন্দ্রীভূত শক্তির জন্ম হয়। এই তিন শতকে আহোমরা পূর্ব দিকে নিজেদের শক্তি সংহত করে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে এবং পশ্চিমে ভূঞাদের দমন করে কোচরা একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এই পরিবর্তন মধ্যযুগের অসমের রাজনৈতিক একীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে নির্দেশ করে।
