কান্ডারী হুঁশিয়ার,Class 10, SEBA, New course
যথাযথ উত্তর দাও।
(ক) “কাণ্ডারী হুশিয়ার” কবিতার কবি— উত্তরঃ (গ) নজরুল ইসলাম।
(খ) খঞ্জর শব্দের অর্থ কী? উত্তরঃ (গ) ছুরি।
(গ) ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতাটি কোন কাব্যের অন্তর্গত উত্তরঃ (গ) সর্বহারা।
(ঘ) মাতৃমুক্তি পণ কে করেছে? উত্তরঃ (ঘ) কবি নজরুল।
(ঙ) বাঙালীর খুনে কার খঞ্জর লাল হয়েছিল? উত্তরঃ (গ) ক্লাইভের।
প্রশ্ন ৩। অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর দাও।
(ক) পলাশির যুদ্ধ কাদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল? উত্তরঃ পলাশির যুদ্ধ নবাব সিরাজদ্দৌলা ও ইংরেজের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। (খ) পলাশির যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর প্রধান কে ছিলেন? উত্তরঃ পলাশির যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর প্রধান ছিলেন লর্ড ক্লাইভ। (গ) ‘‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতার কবি কে? উত্তরঃ ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতার কবি হলেন কাজী নজরুল ইসলাম। (ঘ) মাতৃমন্ত্র শব্দের অর্থ কী? উত্তরঃ মাতৃমন্ত্র শব্দের অর্থ মায়ের মন্ত্রে দীক্ষিত। (ঙ) কবি কবিতায় মহাভারত বলতে কি বুঝিয়েছেন? উত্তরঃ কবি কবিতায় মহাভারত বলতে মহান দায়িত্বকে বুঝিয়েছেন। (চ) কবির মতে অসহায় জাতি কারা? উত্তরঃ কবির মতে অসহায় জাতি হলো বাঙালিরা। (ছ) কবিতাটি কবির কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত? উত্তরঃ কবিতাটি কবির সর্বহারা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। (জ) কবিতায় কাকে কাণ্ডারী বলেছেন? উত্তরঃ কবিতায় মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত বিপ্লবীদের কাণ্ডারী বলেছেন। (ঝ) কোন সালে পলাশির যুদ্ধ হয়েছিল? উত্তরঃ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধ হয়েছিল। (ঞ) ‘ভারতের দিবাকর’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? উত্তরঃ ‘ভারতের দিবাকর’ বলতে কবি ভারতের মুক্তিসূর্যকে বুঝিয়েছেন।
প্রশ্ন ৪। নীচের প্রশ্নগুলির সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও।
(ক) ‘আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ’—উক্তিটির প্রকৃত অর্থ কী?
উত্তরঃ কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতাটিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও গভীর দেশাত্মবোধের মন্ত্র বললে অতিরঞ্জিত হবে না। কাণ্ডারী হলো জনগণের অধিনায়ক। কাণ্ডারীকে মহাপরীক্ষার কালরাত্রি অতিক্রম করতে হবে। ভয়াল মৃত্যুর হাতছানিতে দোদুল্যমান তরণীকে উত্তাল সমুদ্রের বুকের উপর দিয়ে চালিয়ে স্বাধীনতার স্বর্ণ প্রদীপ্ত তোরণে উপনীত করানোতেই সংগ্রামের সার্থকতা নিহিত।
(খ) ‘ওই গঙ্গায়’ বলতে কবি কোন গঙ্গার কথা বলেছেন? সেখানে কীভাবে ভারতের রবি পুনর্বার উদিত হবে?
উত্তরঃ ‘ওই গঙ্গায়’ বলতে কবি ‘পলাশীর প্রান্তর’ রূপ গঙ্গার কথা বুঝিয়েছেন।
কবি স্বাধীনতাকামী কাণ্ডারীকে তাঁদের মহাদায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন যে- তাদের সামনে রয়েছে পলাশির প্রান্তরে ক্লাইভের হত্যালীলার প্রতিশোধের কথা। যে সকল দেশবাসী ফাঁসির মঞ্চে তাঁদের জীবনের জয়গান গেয়ে গেছেন তাঁদের অতৃপ্ত আত্মা আজ অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে রয়েছে- তাঁদের পরে কোন জাতীয় বীর দেশ ও জাতির জন্য মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত হয়ে আছেন?
(গ) কারা ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে গেছেন? তিনজন শহিদের নাম লেখো।
উত্তরঃ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে দেশপ্রেমিকেরা বীরের মতো জীবন উৎসর্গ করে শহীদ হয়েছেন কবি নজরুল তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা অর্পণ করেছেন। জীবনের মহান ব্রতে ব্রতী হয়ে বীর দেশপ্রেমিকেরা হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেছেন জীবনের জয়গান। হাজার হাজার দেশপ্রেমিক বীরকে দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন করতে হয়েছে।
তিনজন শহিদ হলেন-মাস্টারদা সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, মাতঙ্গিনী হাজরা।
(ঘ) পলাশির যুদ্ধে নবাবের পক্ষে-কোন কোন বীর প্রাণপণ যুদ্ধ করে শহিদ হয়েছিলেন?
উত্তরঃ পলাশির যুদ্ধে নবাবের পক্ষে মীরমদন ও মোহনলাল প্রাণপণ যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিলেন।
(ঙ) কারা অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে কাদের বলিদান লক্ষ্য করছেন?
উত্তরঃ ইংরেজ শ্বেতকায় সাহেব ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রকম ছল-চাতুরী, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতাকে অস্ত্ররূপে গ্রহণ করেছে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বহু দেশপ্রেমিককে প্রাণ বিসর্জন করতে হয়েছে। দেশ এখনো স্বাধীন হয়নি, সেজন্য তাদের আত্মা এখনো অশান্ত। বীর শহিদদের অশরীরী আত্মা অলক্ষ্যে এসে দাঁড়িয়ে বর্তমান স্বাধীনতার যোদ্ধাদের বলিদান লক্ষ্য করছেন।
৫। রচনাধর্মী উত্তর লেখো।
প্রশ্ন ১। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতার সারাংশ লেখো।
উত্তরঃ বাংলার বিপ্লবী বীর তরুণ কবি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের পূজারী কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায়, স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সমস্যা সংকুল সংকটময় মুহূর্তে দেশনেতাকে দেশপ্রেমের অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করে দেশ বাঁচানোর দায়িত্ব এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে সাবধান থাকার কথা বলেছেন। ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের বুকে যাত্রীনৌকা বিপন্ন ;এই নৌকা পরিচালনার ভার যে মাঝি বা কাণ্ডারীর, তাকে সতর্ক হতে হবে না হয় ব্যাতা-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে যাত্রীনৌকা ডুবে গিয়ে অসংখ্য প্রাণের বিনাশ হবে। যাত্রীবাহী নৌকা সুরক্ষিতভাবে পরিচালনার ভার যেমন কাণ্ডারীর উপর সমর্পিত তেমনি দেশরূপী সমস্যাক্ষুব্ধ বিপন্ন নৌকার যাত্রী অর্থাৎ দেশবাসীদের রক্ষার ভারও দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত দেশনেতার। সমস্ত জাতিবাদ, প্রাণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি বিসর্জন দিয়ে তার কর্তব্য সমগ্র জাতির মুক্তি আন্দোলনকে ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া অর্থাৎ দেশকে স্বাধীন করা। কবি পলাশীর যুদ্ধের কথাও মনে করিয়ে দিয়ে তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। আজ দেশনেতাকে মুক্তি সংগ্রামের উপযুক্ত নেতৃত্ব দিয়ে দেশের স্বাধীনতাকে উদ্ধার করতে হবে এবং দেশবাসীকে ইংরেজদের গুলামীর হাত থেকে মুক্তি দিতে হবে। সমগ্র কবিতাটি জুড়ে কবির দেশনেতার প্রতি সাবধানবাণী বীরত্বের সুরে অনুরণিত।
প্রশ্ন ৩। কোন পটভূমিতে কবি ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতা লিখেছিলেন তা বর্ণনা করো।
উত্তরঃ কবিতাটির জন্মলগ্নে ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের বাতাবরণ খুব দুর্যোগপূর্ণ, ভ্রাতৃবিচ্ছেদজনিত বেদনার রক্তে ইতিহাস কলঙ্কিত। একদিকে বিপ্লববাদের অগ্নিমশাল, অপরদিকে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন ও আপোষ আলোচনা পথ-কোন পথে স্বাধীনতা অর্জিত হবে এ সম্পর্কে জাতি দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংশয় পীড়িত। ইংরেজ শাসক প্রচারিত দ্বিজাতিতত্ত্বের কলঙ্কিত স্পর্শে জাতীয়জীবন ভ্রাতৃবিচ্ছেদের রক্তপঙ্কিল পথ। নজরুল ইসলাম কবিতার সূচনায় দেশ ও জাতি সম্পর্কে সামগ্রিক সাবধানবাণী উচ্চারণের পর কাণ্ডারী সম্পর্কে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন বলে নামকরণটি সুসংহত ব্যঞ্জনাময় মাধুর্যে দীপ্যমান।
কবিতাটিতে দুর্গম, দুস্তর তিমিররাত্রি, বঞ্চিত, পুঞ্জিত, অসহায় ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহারের দ্বারা স্বাধীনতা সংগ্রামের দুরধিগম্যতা, বাধাবিঘ্ন, মৃত্যু, শঙ্কা, দুর্লঙ্ঘ্যতা ইত্যাদির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ‘‘গিরিসংকট ভীরু যাত্রীরা গুরু গরজায় বাজ ইত্যাদি চিত্রকল্পে স্বাধীনতা সংগ্রামের বন্ধুরতা, বাস্তবতা, কঠিনতা প্রভৃতি রূপায়িত হয়। ‘ক্লাইভ’ ও পলাশী’ ইতিহাস নামবাচক শব্দ দুটি স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র, লুঠেরা মনোবৃত্তি, হীনস্বার্থ-সর্বস্বতা ইত্যাদিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে যেন সংগ্রামীদের সাবধান হওয়ার নির্দেশ প্রদান করে।
প্রশ্ন ৫। কবি মুক্তিকামী কাণ্ডারীকে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছেন তা বর্ণনা করো।
উত্তরঃ স্বদেশপ্রেমিক বাংলার বিদ্রোহী বীর কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতায় যাত্রীদের অর্থাৎ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ব্রিটিশ শাসন, শোষণ এবং অত্যাচারে বিপর্যস্ত দেশের মানুষ অর্থাৎ দেশবাসীদের হুঁশিয়ার বা সাবধান হওয়ার কথা বলেছেন। কবি দেখিয়েছেন দুর্গম গিরি কান্তার মরু এবং দুস্তর পারাবার লঙ্ঘিতে হবে অর্থাৎ পার হতে হবে সুতরাং যাত্রীদের সতর্ক হওয়া দরকার।
বিপ্লবী বাংলার অগ্নিহোত্রী কবি এবং কালজয়ী সংগীতস্রষ্টা কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি দেশাত্মবোধ জাগৃত করার উদ্দিপক মন্ত্র।
আলোচ্য কবিতায় কবির দেশমাতৃকার উদ্ধার কল্পে স্বতন্ত্রতা সংগ্রামী জননায়ক অর্থাৎ নেতার প্রতি তাঁর সতর্ক বাণী নিচয়ের সমষ্টি যা কবিতাকারে কবি হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে প্রকাশিত।
যে শত শত বীর দেশমাতার মুক্তির জন্য স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দিয়ে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে ‘শহীদ’ হয়েছেন, আজ তাঁরাও যেন অলক্ষ্যে এসে দাঁড়িয়ে দেখছেন এবং তাঁদের অশরীরি আত্মা পরোক্ষভাবে তাঁদের উৎসাহিত করেছেন। কবির দেশনেতার প্রতি বক্তব্য তাঁদের জন্য বলিদান দেওয়ার বা আত্মোৎসর্গের সময় সমাগত। দেশ স্বাধীন না হলে তাঁদের আত্মা শান্তি পাবে না। কবি কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতায় বার বার কাণ্ডারী অর্থাৎ দেশনেতাকে সতর্ক থাকতে বলেছেন।
প্রশ্ন ৬। ব্যাখ্যা লেখো।
(ক) দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
উত্তরঃ আলোচ্য অংশটি কবি কাজী নজরুল ইসলামের “কাণ্ডারী হুঁশিয়ার” শীর্ষক কবিতা থেকে নেওয়া।
ভয় মানুষের চিরশত্রু। ভয়হীনতাই প্রকৃত শক্তি। যে আত্মশক্তিতে বিশ্বাসী, ভয়কে সে জয় করতে পারে। শক্তিতে ভীতিকে কবলমুক্ত করে, ভয়কে পদদলিত করে, ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে এই পৃথিবীতে যথার্থ মানুষের মত বাঁচতে হবে। নিশ্চেষ্ট ও পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকা অপেক্ষা মৃত্যুই শ্রেয়। সে মৃত্যুতে গৌরব নেই। যারা ভীরু, যারা ভয়ে গৃহকোণে সারা জীবন আত্মগোপন করে থাকে, যারা মৃত্যুর পূর্বে বহুবার মরে, তারা মানবতার কলঙ্ক। জীবনতরী সকল সময়ে স্বচ্ছন্দে চালিত হয় না। তরী বাইবার সময় ঝড় তুফানের মধ্যে নৌকার হাল ছেড়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লে নৌকা সামলানো যায় না। ঝড় তুফানের মধ্যে নিরুদ্যম না হয়ে শক্তি, সাহস, ধৈর্য ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে নৌকা চালনাতেই মাঝির কৃতিত্ব। পরাজয়ী মনোভাব পরাজয়কে ত্বরান্বিত করে। যত প্রতিকূল অবস্থাই আসুক না কেন, তার বিরুদ্ধে নির্ভয়ে সংগ্রাম করে জয়লাভ অর্জনেই মহত্ত্ব।
(খ) যুগ যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিমান।
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান।
উত্তরঃ আলোচ্য অংশটি কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কাণ্ডারী হুঁশিয়ার শীর্ষক কবিতা থেকে সংকলিত।
মানুষ স্বার্থ ও সম্পদের যন্ত্র নয়, সে ভালোবাসাকে বিস্তৃত করে দিতে পারে অনেকের মধ্যে। তার চেয়ে বড়ো পুজো আর কিছুই হতে পারে না। ভর্ৎসনা, শাসন, উপেক্ষা, যাদের ভাগ্যলিপি তাদের আপনার জন্য ভেবে বুকে টেনে নিলে আত্মার উন্নতি হয়। আমরা মানবসেবার মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করি। সমাজের চারদিকে অশিক্ষা- কুশিক্ষা -দারিদ্র্য-নিপীড়ন। তার ওপরে জাতিভেদ ও কুংসংস্কার সমাজকে করেছে পঙ্গু। তারও ওপরে আছে প্রাকৃতিক অভিশাপ, দৈব, দুর্দৈব—খরা, বন্যা, ভূমিকম্প। সমাজের বুকে এইসব অভিশাপ মানুষের জীবনকে অভিশপ্ত করে তুলেছে। এই অবস্থায় মায়া- স্নেহ- প্রেম- সহমর্মিতার মতো মানবিক চেতনা ও মূল্যবোধ নিয়ে মানুষ মানুষের পাশে থাকলে জীবন সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। মহাপুরুষরা বারবার এই অমৃতবাণী আমাদের শুনিয়েছেন। ভজন পূজন সাধন আরাধনা করে যাঁরা দেবতাকে খোঁজেন, বৃথাই তাঁদের সে খোঁজ। ভগবানকে খুঁজতে গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেমে আসতে হবে।
(গ) কাণ্ডারী! তুমি ভুলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
উত্তরঃ কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতায় দেশ ও দেশবাসীর বিপন্ন অবস্থার কথা চিন্তা করে দেশনেতাকে হুঁশিয়ার করার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলন-কারীদেরও জিজ্ঞেস করেছেন—তাদের মধ্যে কে এমন সৎসাহসী বীর দেশভক্ত যুবক আছে যে দেশের ভবিষ্যৎ রচনা করার এই সংকটময় পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসতে পারে।
পরাধীন ভারতবর্ষ ও ভারতীয়রা আজ নানাভাবে বিপন্ন। সমুদ্রবক্ষে যেমন তুফান বা ঝড় উঠলে সমুদ্রের বুকে ভাসমান নৌকা বা জাহাজ ও তার যাত্রী বিপন্ন হয় এবং নৌকার মাঝি বা জাহাজের কাণ্ডারীকে অনেক কষ্টে ধৈর্য সহকারে সেই দোদুল্যমান জাহাজ বা নৌকাকে পরপারে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিতে হয় এবং সতর্ক হতে হয় দেশনেতারূপী কাণ্ডারীকে আজ দেশ ও দেশের জনতার সুরক্ষার জন্য সেই সতর্কতা পূর্ণদায়িত্বে গ্রহণ করতে হবে।
(ঘ) ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর।
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।
উত্তরঃ আলোচ্য অংশটি কবি কাজী নজরুল ইসলামের কাণ্ডারী হুঁশিয়ার নামক কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে স্বদেশ প্রেমিক বীর বিদ্রোহী কবি মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সেই অজুহাতে দেশনায়ককে সতর্ক করে দিয়েছেন।
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে গঙ্গার তীরের প্রশস্ত ভূমি পলাশির লক্ষবাগ, আম্রকুঞ্জে বাংলার শেষ স্বাধীনচেতা নবাবের সঙ্গে লর্ড ক্লাইভের ইশারায় সেনাপতি মীরজাফর যুদ্ধের নামে কেবল একটা প্রহসন করেছিল মাত্র। এই যুদ্ধে অগণিত বাঙালী বীর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে শেষপর্যন্ত প্রাণ দিয়েছে কিন্তু যুদ্ধে জয় সম্ভব হয়নি। এই যুদ্ধেই ভারতের স্বাধীনতার সূর্য গঙ্গার জলে ডুবে গিয়েছে অর্থাৎ অস্তমিত হয়েছে। এবং ইংরেজদের ভারতে রাজ্য বিস্তারের গোড়াপত্তনও ঘটেছে, তারই পরাজয়ের পরিণাম হিসেবে।
কবি পলাশীর যুদ্ধের ষড়যন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আগামী সংগ্রামের তৈরির জন্য সাবধান হতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য যে সাবধান থাকা প্রয়োজন, কবি বার-বার সেকথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
(ঙ) ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান
আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান?
উত্তরঃ আলোচ্য অংশটি কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শীর্ষক কবিতা থেকে নেওয়া। প্রস্তুত অংশে কবি স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতে যে দেশপ্রেমিক বীরেরা জীবন উৎসর্গ করে শহীদ হয়েছেন, তিনি তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। কবির বক্তব্য ইংরেজ শ্বেতকায় সাহেব ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নানা রকম ছল-চাতুরী, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতাকে অস্ত্ররূপে গ্রহণ করেছে। হাজার হাজার দেশপ্রেমিক বীরকে দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন করতে হয়েছে। দেশ এখনও স্বাধীন হয়নি, সেজন্য তাদের আত্মা আজও অশান্ত। বীর শহীদদের অশরীরি আত্মা আজ অলক্ষ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্যে কবি বলছেন—’জীবনের মহান ব্রতে ব্রতী হয়ে তাঁরা হাসি মুখে ফাঁসি কাষ্ঠে জীবন ত্যাগ করেছেন, তাই তাদের জন্য শ্রদ্ধা অর্পণ মহৎ উদ্দেশ্যে প্রাণত্যাগ দ্বারাই সম্ভব। কবি এই প্রসঙ্গে দেশনেতাকে পুনরায় আর একবার সচেতন করে দিয়েছেন।
প্রশ্ন ৭। তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
(ক) ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
উত্তরঃ জাতিভেদ প্রথা অত্যন্ত নিন্দাকর এবং অসভ্যতার লক্ষণ। মনুষ্যত্বের এই লাঞ্ছনায় সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়, দেশ ও জাতি দুর্বল হয়ে পড়ে। মাতৃমুক্তি মানসে উৎসর্গীকৃতপ্রাণ দেশনেতাকে সেজন্য সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্বন্ধে সচেতন থেকে সকল ডুবন্ত মানুষকে তার মাতার সন্তান, ভাই হিসাবে পরিচয় দিতে হবে।
বিভেদকামী মানুষ যেমন ভাষার নামে, বর্ণের নামে, জাতির নামে দাঙ্গা বাধায়, অরাজকতার সৃষ্টি করে ; তেমনই ধর্মের নামেও একে অপরের বুকে অস্ত্রাঘাত করে। ধর্মের নামেও পৃথিবীতে তাই প্রায়শই লুপ্ত হয় মানবিকতাবোধ, সৃষ্টি হয় অনাচার। কে হিন্দু আর কে মুসলিম, কে খ্রিস্টান আর কে ইহুদি এসব ভেদাভেদ ঈশ্বর সৃষ্টি করে পাঠাননি। এইসব সংকীর্ণ চিন্তা ক্ষুদ্রচেতা মানুষেরই সৃষ্টি। মানুষই মাঝে মাঝে হৃদয়ের দীনতায় নিজের মনুষ্য জন্মের মুখে কালি দেয়। এর জন্যই পৃথিবীতে লুপ্ত হয় মানবিকতাবোধ, সৃষ্টি হয় অনাচার।
। কবির সতর্কবাণী—‘জাতের নামে বজ্জাতি সব, জাত জালিয়াৎ খেলছে জুয়া’। সামনে রেখে তাই কুসংস্কারগুলি ও বিভেদের প্রাচীরগুলি ভেঙে ফেলতে হবে। মহৎপ্রাণ সচেতন দেশনেতা তাই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পৃথিবীতে মনুষ্যত্বের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
(খ) আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রাণ।
উত্তরঃ ধর্মের নাম নিয়ে প্রাত্যহিক জীবনে বহু নিরর্থক সংস্কারের আধিপত্য ঘটলে শক্তিক্ষয় অবশ্যম্ভাবী। এতে ধর্মের ভ্রষ্টতা এবং আচারের অত্যাচার-পরায়ণ অন্যায় রূপ প্রকাশ পায়। মিথ্যা ধর্মবিশ্বাসের অভিঘাতে সমাজ শত খণ্ডে ভেঙে পড়ে, ঈশ্বরের নামে মানুষ মানুষকে করে তোলে অশুচি ও অপাংক্তেয়। একারণেই দেখি আচারের বেড়া গেঁথে যে বহু সংখ্যক মানুষকে দূরে সরিয়েছি তাদের দুর্বলতা এবং মূঢ়তা, তাদের আত্মাবমাননা সমগ্র দেশের ওপর চেপে তাকে অকৃতার্থ করে রেখেছে সুদীর্ঘকাল।
কু-সংস্কারের কাছে ধর্ম প্রাথমিকভাবে পরাজিত হয়। কারণ আগাছার মতো অন্ধ সংস্কারের একটা জোর আছে। আপনি বেড়ে ওঠে, তার জন্য চাষ-আবাদের দরকার হয় না, সহজে মরতেও চায় না। অথচ বিশুদ্ধ জ্ঞানের ও ধর্মের উৎকর্ষের জন্য নিরন্তর সাধনা চাই। মানুষের মনুষ্যত্ব সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্যে নয়, আচারের অনুষ্ঠানেও নয়, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ আছে এই সত্যেই সে সত্য। আর এই সত্য থেকে ধর্ম যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন সে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা নেই।
(গ) পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ।
উত্তরঃ স্বার্থসর্বস্ব মানুষের স্থান এই পৃথিবীতে নেই। কারণ তারা নিজের স্বার্থের চিন্তায় বিভোর থেকে জগৎ সংসারের কথা ভুলে বসে। সেজন্য এইসব আত্মকেন্দ্রিক মানুষ সমাজের বোঝা, দেশ ও জাতির কলঙ্ক, বেঁচে থেকেও এরা মৃতবৎ।
অমৃতের পুত্র মানুষ—সমস্ত জগৎ সংসারের সে অঙ্গীভূত। মন, জ্ঞান এবং আনন্দ উপলব্ধির জন্য স্রষ্টা তাকে যে হৃদয় দিয়েছেন তার খিদে মেটানোর জন্য তাকে অন্যের দ্বারস্থ হতেই হয়। বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় তার যত নিবিড় হয়, ততই তার হৃদয়ের খিদে মেটে, মানবসত্তা জেগে ওঠে, মানবতার উদ্বোধন ঘটে। স্বার্থের ক্ষুদ্র খোলে তখন তাকে ধরে না। সে মহাবিশ্বজীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। কবির ভাষায় সে ‘সংস্কার মুক্ত হয়ে বিশ্বজীবনপ্রবাহে আত্মসমর্পণ’ করে। বৃহৎ, মহৎ জীবনবোধ তার আত্মাকে প্রসারিত করে, ভূমার আনন্দলাভের অধিকারী হয়।
প্রশ্ন ৮। ব্যাকরণ।
(গ) ব্যাসবাক্যসহ সমাসের নাম লেখো।
যুগান্তর — যুগের অন্তর (ষষ্ঠী তৎপুরুষ) মহাভার — মহান যে ভার (কর্মধারয় সমাস)
অসহায — ন সহায় (নঞ তৎপুরুষ)
(খ) বিপরীত শব্দ লেখো।
অধিকার — অনধিকার। দুর্গ — সুগম। পশ্চাৎ — অগ্র। সন্দেহ — নিঃসন্দেহ। অলক্ষ্যে — সম্মুখে।
(গ) নীচে প্রদত্ত শব্দগুলো বাক্যে ব্যবহার করো।
হুঁশিয়ার, হিম্মৎ, সান্ত্রী, অভিযান, সন্তরণ, মাতৃমুক্তি, হানাহানি, মহাভার, পুনর্বার, বলিদান, ত্রাণ, অলক্ষ্যে, বঞ্চিত।
হুঁশিয়ার — নদীর জল ফুলে উঠছে দেখে মাঝি যাত্রীদের হুঁশিয়ার করলেন।
হিম্মৎ — লড়াইয়ে নামার জন্য হিম্মৎ প্রয়োজন।
সান্ত্রী — তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান।
অভিযান — আরোহীরা পর্বত অভিযানে চলেছে।
সন্তরণ — সত্তরণ প্রতিযোগিতায় অনেকে অংশগ্রহণ করে।
মাতৃমুক্তি — বিপ্লবীরা মাতৃমুক্তি পণ করেছে।
হানাহানি — চতুর্দিকে হানাহানি বন্ধ করা প্রয়োজন।
মহাভার — শ্রমিকেরা মহাভার বহন করে দিনের পর দিন চলেছে।
পুনর্বার — সকলে মিলে পুনর্বার সহযোগিতা করেছে।
বলিদান — দেশের স্বার্থে দেশপ্রেমিকেরা আত্মবলিদান দিয়েছে।
ত্রাণ — বন্যায় দুর্গতদের ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।
অলক্ষ্যে — ঈশ্বর অলক্ষ্যে থেকে সব লক্ষ্য করেন।
বঞ্চিত — সর্বহারা মানুষ চিরকাল বঞ্চিতই থেকে যায়।
