মোয়ামরিয়া গণ বিদ্রোহ ,Class 9

তৃতীয় অধ্যায়: মোয়ামরিয়া গণ বিদ্রোহ

অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও :

১. মোয়ামরিয়া বিদ্রোহ কোন রাজার সময়ে শুরু হয়েছিল?

উত্তর: মোয়ামরিয়া বিদ্রোহ আহোম রাজা স্বর্গদেউ লক্ষ্মী সিংহের রাজত্বকালে শুরু হয়েছিল।

২. আহোমদের প্রথম রাজধানী কোথায় ছিল?

উত্তর: আহোমদের প্রথম রাজধানী ছিল চরাইদেউ-এ।

৩. আহোমদের শেষ রাজধানী কোথায় ছিল?

উত্তর: আহোমদের শেষ রাজধানী ছিল যোরহাটে।

৪. মায়ামরা সত্র কোন সংহতির অন্তর্ভুক্ত?

উত্তর: মায়ামরা সত্র কাল সংহতির অন্তর্ভুক্ত।

৫. মায়ামরা সত্রের শিষ্যরা কোন জনগোষ্ঠীর ছিল?

উত্তর: মায়ামরা সত্রের শিষ্যরা প্রধানত মরাণ জনগোষ্ঠীর লোক ছিল।

৬. মায়ামরা সত্রের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

উত্তর: মায়ামরা সত্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শংকরদেবের শিষ্য অনিরুদ্ধ দেব।

৭. আহোমদের কোন স্বর্গদেউয়ের সময়ে মোয়ামরিয়া সত্রাধিকারকে হত্যা করা হয়েছিল ?

উত্তর: আহোম রাজা সুরমফা বা ভগনী রাজার সময়ে মোয়ামরিয়া সত্রাধিকার গুরুনীত পালকে হত্যা করা হয়েছিল।

৮. রুদ্রসিংহের রাজসভায় কোন মোয়ামরিয়া সত্রাধিকারকে অপমান করা হয়েছিল ?

উত্তর: রুদ্রসিংহের রাজসভায় মোয়ামরিয়া সত্রাধিকার চতুর্ভুজ দেবকে অপমান করা হয়েছিল।

৯. আহোমদের প্রধান উপাস্য দেবতার নাম কী ?

উত্তর: আহোমদের প্রধান উপাস্য দেবতার নাম হলো চোমদেউ।

১০. জয়ধ্বজ সিংহ কোন সত্রাধিকারের শরণাগত হয়েছিলেন ?

উত্তর: জয়ধ্বজ সিংহ আউনীআটী সত্রের সত্রাধিকার নিরঞ্জন দেবের শরণাগত হয়েছিলেন।

১১. রুদ্রসিংহ কার শরণ নিয়েছিলেন ?

উত্তর: রুদ্রসিংহ শাক্ত পণ্ডিত কৃষ্ণরাম ভট্টাচার্যের শরণ নিয়েছিলেন।

১২. কৃষ্ণরাম ভট্টাচার্য কে ছিলেন ?

উত্তর: কৃষ্ণরাম ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলার নদীয়া থেকে আসা একজন শাক্ত পণ্ডিত, যাকে ‘পর্বতীয়া গোঁসাই’ বলা হতো।

১৩. কোন আহোম রাজার সময়ে শাক্তধর্ম পল্লবিত হয়েছিল ?

উত্তর: রাজা শিবসিংহের সময়ে তাঁর রানী ফুলেশ্বরীর প্রভাবে শাক্তধর্ম বিশেষ প্রাধান্য পায় এবং পল্লবিত হয়।

১৪. গাগিনি কে ?

উত্তর: গাগিনি ছিলেন মরাণদের নেতা রাঘব মরাণের পুত্র।

১৫. মোয়ামরিয়ারা সর্বপ্রথম কাকে রাজা করেছিলেন ?

উত্তর: মোয়ামরিয়ারা সর্বপ্রথম রমানাথ বা রমাকান্তকে রাজা করেছিলেন।

১৬. ক্যাপ্টেন ওয়েলস কতকাল পর্যন্ত অসমে ছিলেন ?

উত্তর: ১৭৯২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৭৯৪ সালের মে মাস পর্যন্ত ক্যাপ্টেন ওয়েলস অসমে ছিলেন।

১৭. অসমে কতখানি লবন উৎপাদন হয়েছিল ?

উত্তর: ক্যাপ্টেন ওয়েলসের বিবরণ অনুযায়ী, অসমে বছরে প্রায় ২০০০ মণ লবন উৎপাদিত হতো।

১৮. অসমের সাধারণ মানুষ কেন লবন ব্যবহার করতে পারত না ?

উত্তর: লবনের দুষ্প্রাপ্যতা এবং এর অত্যধিক দামের কারণে সাধারণ মানুষ লবন ব্যবহার করতে পারত না।

দীর্ঘ উত্তর দাও :

১. মোয়ামরিয়ারা কারা? এই বিদ্রোহকে গণ অভ্যুত্থান বলা যায় কি ?

উত্তর: মোয়ামরিয়ারা হলো মায়ামরা সত্রের শিষ্য, যারা মূলত মরাণ জনগোষ্ঠীর লোক ছিল। এছাড়াও কছাড়ি, চুতিয়া এবং কৈবর্তদের মধ্যেও এই সত্র জনপ্রিয় ছিল।

এই বিদ্রোহকে অবশ্যই একটি গণ অভ্যুত্থান বলা যায়। কারণ এটি কোনো একক ব্যক্তি বা রাজার ক্ষমতার লড়াই ছিল না। আহোমদের পাইক প্রথার নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য এবং ধর্মীয় নিগ্রহের বিরুদ্ধে সাধারণ শোষিত মানুষ এবং কৃষিজীবী সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দীর্ঘকালীন বিদ্রোহ গড়ে তুলেছিল। বিদ্রোহীরা নিজেদের মধ্যে থেকে রাজা ও কর্মকর্তাদের নির্বাচন করেছিল, যা এর ব্যাপক গণসমর্থনের প্রমাণ দেয়।

২. মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণ করো ?

উত্তর: মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
আহোম রাজতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুর্বলতা বিদ্রোহের সুযোগ করে দেয়।
পাইক প্রথার কঠোর নিয়ম ও সাধারণ মানুষের ওপর সরকারি কর্মকর্তাদের অত্যাচার জনমানসে অসন্তোষ তৈরি করেছিল।
কীর্তিচন্দ্র বরবরুয়ার মতো প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের অহংকার এবং সত্রাধিকারদের অপমান বিদ্রোহীদের ক্ষুব্ধ করে।
স্থানীয় মরাণ নেতাদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা বিদ্রোহের অন্যতম রাজনৈতিক কারণ ছিল।

৩. আহোমের ধর্মীয় নীতির পরিবর্তন মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের কারণ এ সম্পর্কে তোমার মত কী আলোচনা করো।

উত্তর: আহোমদের ধর্মীয় নীতির পরিবর্তন এই বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলোর একটি। আহোম রাজারা শুরুতে পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন, কিন্তু পরে রুদ্রসিংহ এবং শিবসিংহের আমলে তারা বৈষ্ণবধর্ম ত্যাগ করে শাক্তধর্মের প্রতি অনুরাগী হন। রানী ফুলেশ্বরী শাক্তধর্ম প্রচার করতে গিয়ে বৈষ্ণব সত্রাধিকারদের অপমান করেন এবং জোর করে শাক্ত প্রথা চাপিয়ে দেন। মায়ামরা সত্রের শিষ্যরা ছিল অত্যন্ত একনিষ্ঠ, তাদের সত্রাধিকারদের অপমান তারা সহ্য করতে পারেনি। ধর্মীয় নিগ্রহ ও সত্রাধিকারদের ওপর অত্যাচারের ফলেই এই বিদ্রোহ চরম রূপ ধারণ করে।

৪. পাইকপ্রথা মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের নেপথ্যে কতটুকু ভূমিকা নিয়েছিল এ প্রসঙ্গে তোমার মতামত বর্ণনা করো ?

উত্তর: পাইকপ্রথা ছিল আহোম প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ড, কিন্তু এটি বিদ্রোহের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্রের সেবা করতে হতো। ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহ এবং রাস্তাঘাট তৈরির কাজে পাইকদের খাটানোর ফলে তারা কৃষি কাজ করার সময় পেত না, যা চরম অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। পাইকদের ওপর কর্মকর্তাদের অত্যাচার এবং তাদের কোনো মর্যাদা না থাকা বিদ্রোহের আগুনকে উসকে দিয়েছিল। মোয়ামরিয়া বিদ্রোহ মূলত শোষিত পাইকদের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ ছিল।

সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো :

১. কীর্তিচন্দ্র বরবরুয়া: কীর্তিচন্দ্র বরবরুয়া ছিলেন রাজা লক্ষ্মী সিংহের সময়ের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং উদ্ধত আহোম কর্মকর্তা। তাঁর একনায়কতন্ত্র ও দম্ভ বিদ্রোহীদের ক্ষোভের কারণ হয়েছিল। তিনি মোয়ামরিয়া নেতাদের অপমান করেছিলেন যা বিদ্রোহ শুরু হওয়ার একটি তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কাজ করে।

২. ক্যাপ্টেন ওয়েলস: ১৭৯২ সালে আহোম রাজা গৌরীনাথ সিংহের অনুরোধে মোয়ামরিয়া বিদ্রোহ দমন করতে লর্ড কর্নওয়ালিস ক্যাপ্টেন ওয়েলসকে অসমে পাঠান। তিনি গুয়াহাটি ও উত্তর গুয়াহাটি উদ্ধার করেন এবং রাজার অবস্থান সুদৃঢ় করেন। ১৭৯৪ সালে রাজনৈতিক কারণে তাঁকে ফেরত ডাকা হয়, ফলে তাঁর কাজ অর্ধসমাপ্ত থেকে যায়। তাঁর বিবরণ থেকে সেকালের অসমের রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *