মানের অসম আক্রমণ, Class-9

চতুর্থ অধ্যায়: মানের অসম আক্রমণ

সঠিক উত্তরটি বেছে নাও :

১। ১৮১৬/১৮১৭/১৮১৯ সালে মানেরা অসমের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছিল।

উত্তর: ১৮১৭ সালে।

২। জগন্নাথ ঢেকিয়াল ফুকন / বদনচন্দ্র বরফুকন / চন্দ্রকান্ত বুড়াগোঁহাই রুচিনাথ বুড়াগোঁহাইর ভাই ছিলেন।

উত্তর: চন্দ্রকান্ত বুড়াগোঁহাই (সঠিক উত্তর পাঠ্যপুস্তকের তথ্য অনুযায়ী বিচার্য, তবে এখানে রুচিনাথ বুড়াগোঁহাই ছিলেন পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাইর পুত্র)।

৩। বদনচন্দ্রের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল ১৮১৬/১৮১৭/১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে।

উত্তর: ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ।

৪। রাজমাও নুমলী চন্দ্রকান্ত সিংহ / পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাই / ব্রজনাথ গোঁহাইর মাতা ছিলেন।

উত্তর: চন্দ্রকান্ত সিংহ।

৫। ইয়ান্ডাবু সন্ধি ১৮১৪ / ১৮২৬ / ১৮২৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে স্বাক্ষর করা হয়েছিল।

উত্তর: ১৮২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি।

রচনাধর্মী প্রশ্ন এবং উত্তর :

১। মণিপুর এবং আরাকানে মানের রাজ্য বিস্তার সম্পর্কে সংক্ষেপে উল্লেখ করো।

উত্তর: মান রাজা বদৌপায়া এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য গঠনের লক্ষ্যে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে আক্রমণ শুরু করেন। ১৭৮৪ সালে তিনি স্বাধীন রাজ্য আরাকান দখল করেন এবং সেখানকার প্রায় ২০,০০০ মানুষকে বন্দি করে নিজের দেশে নিয়ে যান। এর ফলে আরাকানের বহু মানুষ ব্রিটিশ শাসিত চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয়। এরপর ১৮১৩ সালে মান সেনারা মণিপুরে হস্তক্ষেপ করে এবং সেখানকার রাজা চৌরজিৎ সিংকে হটিয়ে মারজিৎ সিংকে সিংহাসনে বসায়। এভাবে মানের প্রভাব মণিপুর ও আরাকানে সুদৃঢ় হয়।

২। পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাইর স্বেচ্ছাচারিতা কীভাবে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল আলোচনা করো।

উত্তর: রাজা গৌরীনাথ সিংহের মৃত্যুর পর পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাই অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং অনেকটা একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে শাসন চালাতে শুরু করেন। তিনি নিজের আত্মীয়-স্বজনদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান এবং রাজার ক্ষমতা খর্ব করেন। তাঁর এই স্বেচ্ছাচারিতা এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা অন্যান্য আমলা ও রাজবংশীয়দের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বদনচন্দ্র বরফুকনের সাথে তাঁর বিরোধ চরমে ওঠে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলই শেষ পর্যন্ত পূর্ণানন্দের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জন্ম দেয়।

৩। পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাইর বিরুদ্ধে সংঘটিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল?

উত্তর: পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাইর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক ছিলেন বদনচন্দ্র বরফুকন। পূর্ণানন্দ তাঁকে বন্দি করার চেষ্টা করলে তিনি পালিয়ে মান দেশে চলে যান এবং মান রাজার সাহায্য প্রার্থনা করেন। এর ফলে ১৮১৭ সালে মানেরা প্রথমবার অসম আক্রমণ করে। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেই পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাইর স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে (মতান্তরে তিনি বিষপানে আত্মহত্যা করেন)। তাঁর মৃত্যুর ফলে আহোম শাসনের ভিত পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং মানের আধিপত্যের পথ প্রশস্ত হয়।

৪। বদনচন্দ্র বরফুকনের নেতৃত্বে মানেরা অসম আক্রমণ করেছিল নাকি? যুক্তি দেখিয়ে প্রমাণ করো।

উত্তর: তথ্য অনুযায়ী, মানেরা বদনচন্দ্রের নেতৃত্বে নয়, বরং বদনচন্দ্রের আমন্ত্রণে এবং তাঁর সহায়তায় অসম আক্রমণ করেছিল। মান রাজা বদৌপায়া বদনচন্দ্রের অনুরোধে প্রায় ১৬,০০০ সেনা পাঠিয়েছিলেন। বদনচন্দ্র এই মান সেনাদের পথ দেখিয়ে অসমে নিয়ে আসেন এবং আহোম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে সাহায্য করেন। সুতরাং, মান সেনারা ছিল মূল আক্রমণকারী শক্তি এবং বদনচন্দ্র ছিলেন তাদের মিত্র ও পথপ্রদর্শক।

৫। বদনচন্দ্র বরফুকনের নেতৃত্বে অসমে মানের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর: বদনচন্দ্র বরফুকন নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা ও পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাইর ওপর প্রতিশোধ নিতে মান রাজাকে রাজি করিয়েছিলেন। ১৮১৭ সালে মান সেনারা তাঁর সাথে অসমে প্রবেশ করে ঘিলাধারী নামক স্থানে আহোমদের পরাজিত করে। এর ফলে বদনচন্দ্র পুনরায় বরফুকন পদ লাভ করেন এবং রাজ দরবারে নিজের প্রভাব ফিরিয়ে আনেন। তবে তিনি কার্যত মানের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন এবং তাঁর এই পদক্ষেপ অসমের স্বাধীনতার অন্তিম ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।

৬। মানের অসম আক্রমণের কারণ সমূহ আলোচনা করো।

উত্তর: মানের অসম আক্রমণের প্রধান কারণগুলো হলো:

ক) আহোম প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাই ও বদনচন্দ্র বরফুকনের বিরোধ।

খ) বদনচন্দ্র বরফুকনের সরাসরি মান দেশে গিয়ে সাহায্যের প্রার্থনা।

গ) মান রাজা বদৌপায়ার সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রভাব বিস্তার করার ইচ্ছা।

ঘ) মোয়ামরিয়া বিদ্রোহের ফলে আহোম রাজতন্ত্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা।

৭। মানের অসম আক্রমণের পরিণতি বিস্তারিতভাবে দেখাও।

উত্তর: মানের অসম আক্রমণের পরিণতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ:

ক) আহোমদের ৬০০ বছরের স্বাধীন শাসনের অবসান ঘটে।

খ) অসমের সাধারণ মানুষের ওপর মান সেনারা অকথ্য নির্যাতন, লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ড চালায়।

গ) কৃষিব্যবস্থা ও অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

ঘ) শেষ পর্যন্ত ১৮২৬ সালে ইয়ান্ডাবু সন্ধির মাধ্যমে অসম ব্রিটিশদের শাসনাধীনে চলে যায়।

৮। কোন বিদ্রোহকে ‘পানিমুয়া বিদ্রোহ’ বলা হয়?

উত্তর: পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাইর স্বেচ্ছাচারী শাসনের বিরুদ্ধে পানিমুয়া নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ১৮০৩ সালে যে বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল, তাকেই ‘পানিমুয়া বিদ্রোহ’ বলা হয়।

৯। ১৮১৭ সালে অসমে মানদের হস্তক্ষেপের দুটি ফলাফল উল্লেখ করো।

উত্তর:

১. বদনচন্দ্র বরফুকন পুনরায় তাঁর ক্ষমতা ও পদ ফিরে পান।

২. আহোম রাজশক্তি মানদের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও উপঢৌকন দিতে বাধ্য হয় এবং মানের প্রভাব সুনিশ্চিত হয়।

১০। প্রথম ইন্দো-বার্মা যুদ্ধ কখন সংঘটিত হয়েছিল? এই যুদ্ধটি কোথায় সংঘটিত হয়েছিল?

উত্তর: প্রথম ইন্দো-বার্মা (বা প্রথম ইঙ্গ-বর্মী) যুদ্ধ ১৮২৪ সালে শুরু হয়েছিল। এই যুদ্ধ প্রধানত অসম, মণিপুর, আরাকান এবং ব্রহ্মদেশের রেঙ্গুন অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছিল ।

১১। ইয়ান্ডাবু সন্ধির উল্লেখযোগ্য ফলাফলগুলি উল্লেখ করো।

উত্তর: ইয়ান্ডাবু সন্ধির ফলাফলগুলো হলো:

১. মান রাজা ব্রিটিশদের এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হন।
২. অসম, মণিপুর ও আরাকান থেকে মানেরা চিরতরে বিদায় নেয়।
৩. অসমের শাসনভার আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়।

১২। ইয়ান্ডাবু সন্ধির গুরুত্ব সম্পর্কে লেখো।

উত্তর: অসমের ইতিহাসে ইয়ান্ডাবু সন্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল যুদ্ধের অবসান ঘটায়নি, বরং অসমে মধ্যযুগীয় আহোম শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে আধুনিক ব্রিটিশ শাসনের সূচনা করে। এর ফলে অসমে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে এবং মানদের অত্যাচারের হাত থেকে মানুষ সাময়িকভাবে মুক্তি পায়।

সংক্ষিপ্ত টীকা :

(১) বদৌপায়া: তিনি ছিলেন ব্রহ্মদেশের (মান দেশের) এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজা। তাঁর সময়েই মানের সাম্রাজ্য ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয় এবং তিনি বদনচন্দ্র বরফুকনের অনুরোধে প্রথমবার অসমে সেনা পাঠিয়েছিলেন।

(২) চন্দ্রকান্ত সিংহ: তিনি ছিলেন আহোম রাজা (১৮১১-১৮১৮), যাঁর রাজত্বকালেই মানেরা প্রথমবার অসম আক্রমণ করে। তিনি পূর্ণানন্দ বুড়াগোঁহাইর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলেন এবং পরিস্থিতির চাপে পড়ে মানদের বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন।

(৩) ইয়ান্ডাবু সন্ধি: ১৮২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ এবং মানদের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই ঐতিহাসিক সন্ধির মাধ্যমে প্রথম ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধের অবসান হয়। এই সন্ধির ফলেই অসমের স্বাধীনতা চিরতরে হারিয়ে যায় এবং ব্রিটিশ রাজত্বের সূচনা হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *