ভারতবর্ষের ভূগোল

অধ্যায়: ভারতবর্ষের ভূগোল

ভারতবর্ষের ভূগোল – অনুশীলনী সমাধান

১। ভারতবর্ষের ভৌগোলিক অবস্থানের বিবরণ দাও।

উত্তর : ভারতবর্ষ পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে এবং এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণাংশে অবস্থিত। এর অক্ষাংশগত বিস্তার 8° 4′ 28″ উত্তর থেকে 37° 17′ 53″ উত্তর অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমাংশগত বিস্তার 68° 7′ 33″ পূর্ব থেকে 97° 24′ 47″ পূর্ব দ্রাঘিমারেখার মধ্যে। 23½° উত্তর অক্ষরেখা বা কর্কটক্রান্তি রেখা ভারতের মধ্য দিয়ে গিয়ে দেশটিকে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুটি সমান ভাগে ভাগ করেছে।

২। ভারতের উপকূল রেখার দৈর্ঘ্য কত?

উত্তর : ভারতের ভূভাগে মোট উপকূল রেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬,১০০ কিলোমিটার।

৩। ভারতের মোট স্থলসীমার দৈর্ঘ্য কত?

উত্তর: ভারতের মোট স্থলসীমার দৈর্ঘ্য ১৫,২০০ কিলোমিটার।

৪। ভারতের ভূ-খণ্ড সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো।

উত্তর: ভারতবর্ষ ৩২,৮৭,২৬৩ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম দেশ। এটি ব্রিটিশ যুক্তরাষ্টের চেয়ে ১৩ গুণ এবং জাপানের চেয়ে ৯ গুণ বড়। এর উত্তর-দক্ষিণের বিস্তার ৩,২১৪ কি.মি. এবং পূর্ব-পশ্চিমের বিস্তার ২,৯৩৩ কি.মি.। বৈচিত্র্যময় এই ভূ-খণ্ডে পর্বত, মালভূমি, সমভূমি এবং মরুভূমির মতো বিভিন্ন ভূ-প্রকৃতি দেখা যায়। বিশাল আকার ও বৈচিত্র্যের জন্য একে ‘উপমহাদেশ’ বলা হয়।

৫। উত্তর ভারত এবং দক্ষিণ ভারতের নদীগুলোর চারটি মূল পার্থক্য লেখো।

উত্তর: উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের নদীগুলোর প্রধান চারটি পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো:

ক) জলের উৎস: উত্তর ভারতের নদীগুলো বরফাবৃত পর্বত থেকে সৃষ্ট বলে সারা বছর জল থাকে, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের নদীগুলো বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় গ্রীষ্মকালে প্রায় শুকিয়ে যায়।

খ) গতিপথের অবস্থা: উত্তর ভারতের নদীগুলোতে উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন—তিনটি গতিই স্পষ্ট; কিন্তু দক্ষিণ ভারতের নদীগুলোতে এই পার্থক্য স্পষ্ট নয়।

গ) নাব্যতা: উত্তর ভারতের নদীগুলো সমতলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ও ধীরগতির বলে নাব্য, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের নদীগুলো খরস্রোতা হওয়ায় নাব্য নয়।

ঘ) বিদ্যুৎ উৎপাদন: উত্তর ভারতের নদীগুলো বেশি পলি বহন করে এবং খরস্রোতা নয় বলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের তেমন উপযোগী নয়, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের নদীগুলো খরস্রোতা হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

৬। ভারতের ভূ-প্রাকৃতিক ভাগগুলো কী কী?

উত্তর: ভারতের ভূ-প্রকৃতিকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:

(ক) উত্তরের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল,

(খ) উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চল,

(গ) দাক্ষিণাত্য মালভূমি অঞ্চল এবং

(ঘ) উপকূল অঞ্চল।

৭। উত্তর ভারতের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: হিমালয় পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভঙ্গিল পর্বতমালা। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

ক)এটি কাশ্মীরের নঙ্গ পর্বত থেকে অরুণাচলের পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ২,৫০০ কি.মি. দীর্ঘ।

খ) এর তিনটি প্রধান সমান্তরাল শ্রেণি আছে—উচ্চ হিমালয়, নিম্ন হিমালয় এবং বহি-হিমালয় বা শিবালিক।

গ) এই অঞ্চলটি টারসিয়েরি যুগে টেথিস সাগরের গাদ বা পলি চাপে ওপরে উঠে সৃষ্টি হয়েছে।

ঘ) এখানকার উচ্চ শিখরগুলো বরফাবৃত এবং এখান থেকেই উত্তর ভারতের প্রধান নদ-নদীগুলোর উৎপত্তি হয়েছে।

৮। উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: হিমালয় এবং দক্ষিণ ভারতের মালভূমির মাঝখানে এই বিশাল সমভূমি অবস্থিত। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

ক) এটি সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এবং এদের উপনদীগুলোর বাহিত পলি দিয়ে গঠিত উর্বর সমভূমি ।

খ )পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত এর বিস্তার প্রায় ২,৪০০ কি.মি.।

গ) উর্বর মৃত্তিকা ও উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য এটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং কৃষিকার্যে উন্নত।

৯। দাক্ষিণাত্য মালভূমি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর : উত্তর ভারতের সমভূমির দক্ষিণে অবস্থিত এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

১. এটি একটি ত্রিভুজাকৃতি অঞ্চল যা প্রাচীন কঠিন শিলা দিয়ে গঠিত।

২ . বিন্ধ্য, সাতপুরা প্রভৃতি পর্বতমালা একে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুটি ভাগে ভাগ করেছে।

৩. এর পশ্চিম সীমানায় পশ্চিমঘাট এবং পূর্ব সীমানায় পূর্বঘাট পর্বতমালা অবস্থিত।

৪. বেশিরভাগ নদী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঢালু হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।

১০। উপকূল অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: ভারতের উপকূলীয় সমতল অঞ্চল দীর্ঘ কিন্তু সংকীর্ণ।

পূর্ব উপকূল: এটি বঙ্গোপসাগর ও পূর্বঘাট পর্বতের মাঝে অবস্থিত এবং উর্বর ব-দ্বীপ নিয়ে গঠিত। একে উত্তর সরকার ও করমণ্ডল উপকূলে ভাগ করা হয়।

পশ্চিম উপকূল: এটি আরব সাগর ও পশ্চিমঘাট পর্বতের মাঝে অবস্থিত এবং অপেক্ষাকৃত বেশি সংকীর্ণ। একে কঙ্কণ ও মালাবার উপকূলে ভাগ করা হয়।

১১। ভারতের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: ভারতের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

১. এটি মূলত মৌসুমি বায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

২. দেশটির অক্ষাংশগত বিস্তৃতির জন্য উত্তরে সমভাবাপন্ন এবং দক্ষিণে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উষ্ণ জলবায়ু দেখা যায়।

৩. উচ্চতা ও ভূ-প্রকৃতির পার্থক্যের কারণে একই অক্ষাংশে থাকা স্থানগুলোর মধ্যেও উত্তাপের তারতম্য ঘটে (যেমন—আগ্রা ও দার্জিলিং)।

১২। মৌসুমি বায়ুর প্রভাব সম্পর্কে একটি টীকা লেখো।

উত্তর: ভারতের জলবায়ু ও অর্থনীতিতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব অপরিসীম। গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্প নিয়ে এসে ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। অন্যদিকে শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে করমণ্ডল উপকূলে কিছু বৃষ্টি হয়। ভারতের কৃষি মৌসুমি বৃষ্টির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।

১৩। ভারতের বৃষ্টির বিন্যাস সম্পর্কে একটি আভাস দাও।

উত্তর: ভারতে বৃষ্টিপাতের বিতরণ সব জায়গায় সমান নয়।

মেঘালয় মালভূমি ও পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে ৩০০ সে.মি.-এর বেশি বৃষ্টি হয়।

চেরাপুঞ্জিতে বার্ষিক ১,২৫০ সে.মি. পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়।

ব্রহ্মপুত্র সমভূমি ও উত্তর ভারতে বৃষ্টিপাত মাঝারি (১০০-২০০ সে.মি.)।

রাজস্থানের থর মরুভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম (৫০ সে.মি.-এর কম)।

১৪। ভারতের উদ্ভিদগুলোকে কয়টি ভাগে ভাগ করা যায় লেখো।

উত্তর: ভারতের উদ্ভিদকে প্রধানত ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়:

(ক) চিরসবুজ উদ্ভিদ,

(খ) মরসুমি উদ্ভিদ,

(গ) কাঁটাযুক্ত মরু উদ্ভিদ,

(ঘ) তৃণজাতীয় উদ্ভিদ,

(ঙ) ব-দ্বীপীয় বা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এবং

(চ) পার্বত্য উদ্ভিদ।

১৫। ভারতের চিরসবুজ উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২০০ সে.মি.-এর বেশি এবং উত্তাপ 25^\circ-27^\circ সে. হয়, সেখানে এই উদ্ভিদ দেখা যায়।

এদের পাতা বছরের কোনো ঋতুতেই একসঙ্গে ঝরে পড়ে না।

গাছগুলো প্রায় ৪৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে (যেমন—চন্দন, রবার)।

১৬। ভারতের পার্বত্য উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: পার্বত্য অঞ্চলে উচ্চতাভেদে উদ্ভিদের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ১০০০ মিটার উচ্চতায় মৌসুমি অরণ্য ও বাঁশ দেখা যায়। ১০০০-২০০০ মিটারে সরলবর্গীয় চিরসবুজ অরণ্য এবং তার ওপরে কেবল আল্পীয় উদ্ভিদ দেখা যায়।

১৭। ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা কত? এর ঘনত্ব কত?

উত্তর: ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে ভারতের জনসংখ্যা ১,২১০,৭২৬,৯৩২ জন। এ সময় জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৩৮২ জন।

১৮। জনপ্রব্রজন কয় প্রকার এবং কী কী?

উত্তর: জনপ্রব্রজন প্রধানত দুই প্রকার:

(ক) আভ্যন্তরীণ প্রব্রজন (দেশের ভেতরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে) এবং

(খ) বাহ্যিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রব্রজন (এক দেশ থেকে অন্য দেশে)।

১৯। ভারতের অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো লেখো।

উত্তর: ভারতীয় অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. নিম্ন মাথাপিছু আয় ও মন্থর অর্থনৈতিক গতি।

২. অত্যধিক জনসংখ্যার চাপ ও দারিদ্র্য।

৩. কৃষির ওপর অত্যাধিক নির্ভরশীলতা (৬০% মানুষ কৃষিজীবী)।

৪. বেকার সমস্যা এবং পরিকল্পনাভিত্তিক উন্নয়ন ব্যবস্থা ।

২০। ভারতের কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলগুলো কী কী?

উত্তর: ২০২৫ সালের সারণি অনুসারে ভারতের ৮টি কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চল হলো:

(১) আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ,

(২) চণ্ডীগড়,

(৩) দিল্লি,

(৪) দাদরা ও নগর হাভেলি ও দমন ও দিউ,

(৫) লাক্ষাদ্বীপ ,

(৬) পণ্ডিচেরি ,

৭) জম্মু ও কাশ্মীর এবং

৮) লাদাখ।

২১। ভারতের বর্তমান রাজ্য কয়টি?

উত্তর: আপনার বইয়ের পাঠ্য তথ্য অনুযায়ী ভারতে বর্তমানে ২৯টি রাজ্য আছে। (দ্রষ্টব্য: বর্তমান প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী ২৮টি রাজ্য)।

২২। ভারতের সম্প্রতি গঠিত রাজ্য কোনটি?

উত্তর: ২০১৪ সালে গঠিত হওয়া ভারতের নবীনতম রাজ্যটি হলো তেলেঙ্গানা।

২৩। জনপ্রব্রজনের ফলে ভারতে কীরূপ প্রভাব পড়েছে?

উত্তর: জনপ্রব্রজনের সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো হলো:

ক) জাতি, ধর্ম ও ভাষার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং বহু বর্ণী সংস্কৃতির সৃষ্টি।

খ) জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি।

গ) শহরাঞ্চলে অস্বাস্থ্যকর বস্তি এলাকা গড়ে ওঠা।

ঘ)‌ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অত্যধিক চাপ পড়া এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *