বলাই, Class -10, SEBA board exam
‘বলাই’ পাঠের অনুশীলনীর সমাধান
১. ক) অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন:
১) ‘বলাই’ পাঠটির লেখক কে?
উত্তর: ‘বলাই’ পাঠটির লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
২) বলাইয়ের সঙ্গে লেখকের কী সম্পর্ক ছিল?
উত্তর: বলাই ছিল লেখকের ভাইপো।
৩) অতি পুরানো বটের কোটরে কারা বাসা বেঁধে আছে?
উত্তর: অতি পুরানো বটের কোটরে বেঙ্গমা-বেঙ্গমী নামে একজোড়া অতি পুরানো পাখি বাসা বেঁধে আছে।
৪) বলাইয়ের মা কোথায় গিয়েছিল?
উত্তর: বলাইয়ের মা তো নেই (মা মারা গেছেন)।
৫) একদিন সকালে বলাই ওর কাকাকে কী দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল?
উত্তর: একদিন সকালে বলাই ওর কাকাকে একটা শিমুল গাছের চারা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল, যেটি বাগানের খোওয়া-দেওয়া রাস্তার মাঝখানেই উঠেছিল।
৬) বলাইয়ের সবচেয়ে বেশি স্নেহ কীসের উপর ছিল?
উত্তর: বলাইয়ের সবচেয়ে বেশি স্নেহ ছিল শিমুল গাছটার উপর।
৭) শিমলে থেকে বলাই ওর কাকিমাকে কী পাঠিয়ে দেবার জন্য চিঠি পাঠিয়েছিল?
উত্তর: শিমলে থেকে বলাই ওর কাকিমাকে সেই শিমুল গাছের একটা ফোটোগ্রাফ পাঠিয়ে দেবার জন্য চিঠি পাঠিয়েছিল।
৮) বলাইয়ের বাবা বলাইকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন?
উত্তর: বলাইয়ের বাবা বলাইকে প্রথমে সিমলে এবং তার পরে বিলেত নিয়ে যাবার কথা ছিল।
৯) বিলাত যাবার পূর্বে বলাই তার কোন বন্ধুর ছবি নিয়ে যেতে চেয়েছিল?
উত্তর: বিলাত যাবার পূর্বে বলাই তার শিমুল গাছটার ছবি নিয়ে যেতে চেয়েছিল, যাকে সে বন্ধু মনে করত।
১০) মা মারা যাওয়ার পর বলাইকে কে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে?
উত্তর: মা মারা যাওয়ার পর বলাইকে তার কাকি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে।
১. খ) শুদ্ধ অশুদ্ধ নির্ণয় করো:
বলাই একটি মেয়ের নাম।
উত্তর: অশুদ্ধ।
বেশি কথা কইতে পারে না বলে বলাইকে অনেক বেশি ভাবতে হয়।
উত্তর: শুদ্ধ।
লেখকের ছোট ভাইয়ের নাম ছিল বলাই।
উত্তর: অশুদ্ধ (বলাই লেখকের ভাইপো)।
শিমুল গাছটি ছিল বলাইয়ের প্রাণের দোসর।
উত্তর: শুদ্ধ।
‘বলাই’ পাঠটির লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
উত্তর: অশুদ্ধ (‘বলাই’ পাঠটির লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
১. গ) শূন্যস্থান পূরণ করো:
মাঘের শেষে আমের বোল ধরে।
ফাল্গুনে পুষ্পিত শালবনের মতোই ওর অন্তর-প্রকৃতি চার দিকে বিস্তৃত হয়ে উঠে।
ও কাউকে না বলে আস্তে আস্তে গিয়ে সেই দেবদারু বনের নিস্তব্ধ ছায়াতলে একলা অবাক হয়ে বসে থাকে।
শিমুল গাছ বাড়েও দ্রুত, কিন্তু বলাইয়ের আগ্রহের পাল্লা দিতে পারে না।
আমার সঙ্গে যখন পারলে না, এই মাতৃহীন শিশুটি গেল কাকির কাছে।
ওই গাছ যে ছিল তাঁর বলাইয়ের প্রতিরূপ, তারই প্রাণের দোসর।
২. ক) বাক্য রচনা করো:
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে: ছেলেটি তার মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
আঁকু পাঁকু: সদ্য গজিয়ে-ওঠা কচি কচি পাতাগুলো যেন কী একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবার জন্য আঁকু পাঁকু করে।
গড়াতে গড়াতে: পাহাড়ের ঢালু বেয়ে গড়াতে গড়াতে বলাই হেসে উঠল।
সুড়সুড়ি: ঘাসের আগায় ওর ঘাড়ের কাছে সুড়সুড়ি লাগত।
খিলখিল: ঘাড়ের কাছে সুড়সুড়ি লাগতে বলাই খিলখিল করে হেসে উঠত।
ছমছম: দেবদারুবনের নিস্তব্ধ ছায়াতলে দাঁড়িয়ে বলাইয়ের গা ছমছম করে।
স্তরে স্তরে: পুবদিকের আকাশে কালো মেঘ স্তরে স্তরে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়ায়।
দেখে দেখে: ঘাসের ভিতরে ভিতরে ও প্রত্যহ দেখে দেখে বেড়িয়েছে।
ব’সে ব’সে: তখন ওর একলা ব’সে ব’সে আপন মনে কথা কইতে ইচ্ছে করে।
ড্যাবা-ড্যাবা: ওই ড্যাবা-ড্যাবা-চোখ-মেলে সর্বদা-তাকিয়ে-থাকা ছেলেটা বেশি কথা কইতে পারে না।
ছোটো ছোটো: বেগনি হলদে নামহারা ছোটো ছোটো ফুল ঘাসের ভিতরে ভিতরে ফুটে থাকত।
অহি-নকুল: মানুষ তার ভিতরকার অহি-নকুলকে এক খাঁচায় ধরে রেখেছে।
জোড়াতাড়া: যা-কিছু গল্প শুনেছে সব নিয়ে জোড়াতাড়া দিয়ে আপন মনে কথা কইতে ইচ্ছে করে।
ঝম ঝম: ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ে, ওর সমস্ত গা যেন শুনতে পায় সেই বৃষ্টির শব্দ।
২. খ) টীকা লেখো:
বলাই: বলাই হল আলোচ্য গল্পের প্রধান চরিত্র এবং লেখকের ভাইপো। তার প্রকৃতিতে গাছপালার মূল সুরগুলোই হয়েছে প্রবল। সে ছিল একজন প্রকৃতিপ্রেমী। ছেলেবেলা থেকেই সে চুপচাপ চেয়ে চেয়ে প্রকৃতির বিচিত্র সৃষ্টিকে দেখত। সে গাছপালা, ছোট ছোট চারাগাছ ও নামহারা ফুলদের প্রতি গভীর স্নেহ অনুভব করত এবং তাদের আঘাত দেখলে মনে কষ্ট পেত, যা তার চারপাশের লোকেরা বুঝত না। সে রাস্তার মাঝখানে গজিয়ে ওঠা একটি শিমুল গাছকে প্রাণের দোসর মনে করত। তার বাবা তাকে বিলাতি কায়দায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিমলে নিয়ে গেলে সে প্রিয় শিমুল গাছটির ফোটোগ্রাফ চেয়েছিল।
শিমুল গাছ: বলাইদের বাগানের খোওয়া-দেওয়া রাস্তার মাঝখানে গজিয়ে ওঠা একটি শিমুল গাছকে কেন্দ্র করে গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আবর্তিত হয়েছে। এটি ছিল একটি লক্ষ্মীছাড়া গাছ, যা দ্রুত বেড়ে উঠেছিল। যখন অঙ্কুর বেরিয়েছিল, তখন থেকেই বলাই এটিকে জল দিত ও প্রতিদিন দেখত। এই গাছটির প্রতি বলাইয়ের ছিল সব চেয়ে স্নেহ; সে এটিকে কাটতে দিতে চায়নি। পরে গাছটিকে কেটে ফেলা হলে বলাইয়ের কাকিমা দুঃখে অন্ন গ্রহণ করেননি, কারণ এটি ছিল বলাইয়ের প্রতিরূপ, তারই প্রাণের দোসর।
বেঙ্গমা-বেঙ্গমী: বেঙ্গমা-বেঙ্গমী হল রূপকথার চরিত্র। বলাই যখন একলা বসে আপন মনে কথা কইত, তখন সে যা-কিছু গল্প শুনেছে সব নিয়ে জোড়াতাড়া দিত। অতি পুরানো বটের কোটরে বাসা বেঁধে থাকা একজোড়া অতি পুরানো পাখি ছিল এই বেঙ্গমা-বেঙ্গমী, যাদের গল্প সে ভাবত। এটি বলাইয়ের কল্পনাপ্রবণ মন এবং গল্প শোনার ও ভাবার অভ্যাসের পরিচয় দেয়।
খোঁয়াড়: খোঁয়াড় শব্দের অর্থ হল গরু, মোষ, ছাগল ইত্যাদি আটকে রাখার জায়গা। লেখক মানব প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, আমরা মানুষ বলি সেই পদার্থকে, যেটি আমাদের ভিতরকার সব জীবজন্তুকে মিলিয়ে এক করে নিয়েছে— অর্থাৎ আমাদের বাঘ-গোরুকে এক খোঁয়াড়ে দিয়েছে পুরে, অহি-নকুলকে এক খাঁচায় ধরে রেখেছে। অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে যে নানা ধরনের প্রবৃত্তি বা বৈশিষ্ট্য (জীবজন্তুর প্রচ্ছন্ন পরিচয়) থাকে, মানুষ তাদের নিয়ন্ত্রণ করে বা এক সূত্রে বাঁধে।
৩. সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন:
ক) ছেলেবেলা থেকে বলাইয়ের কী অভ্যাস ছিল?
উত্তর: ছেলেবেলা থেকে বলাইয়ের অভ্যাস ছিল চুপচাপ চেয়ে চেয়ে দেখা, নড়ে-চড়ে বেড়ানো নয়। সে প্রকৃতির বিচিত্র সৃষ্টিকে, যেমন কালো মেঘ, বৃষ্টি, বোটদদুর, আমের বোল, পুষ্পিত শালবন, ও ছোট ছোট অঙ্কুরকে নিবিড় সুন্দর ভাবে দেখত।
খ) কখন, কেমন করে বলাইয়ের অন্তর-প্রকৃতিতে ঘন রং লাগে?
উত্তর: মাঘের শেষে আমের বোল ধরলে, তার একটা নিবিড় আনন্দ জেগে ওঠে ওর রক্তের মধ্যে, একটা কিসের অব্যক্ত স্মৃতিতে; ফাল্গুনে পুষ্পিত শালবনের মতোই ওর অন্তর-প্রকৃতিটা চার দিকে বিস্তৃত হয়ে ওঠে, ভরে ওঠে, তাতে একটা ঘন রঙ লাগে।
গ) বস্তুত আমরা কোন পদার্থকে মানুষ বলে থাকি?
উত্তর: বস্তুত আমরা মানুষ বলি সেই পদার্থকে যেটা আমাদের ভিতরকার সব জীবজন্তুকে মিলিয়ে এক করে নিয়েছে— অর্থাৎ, আমাদের বাঘ-গোরুকে এক খোঁয়াড়ে দিয়েছে পুরে, অহি-নকুলকে এক খাঁচায় ধরে রেখেছে।
ঘ) ‘কেউ গাছের ফুল তোলে এইটে ওর বড়ো বাজে’— এখানে ‘ওর’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? কেউ গাছের ফুল তুললে ওর বাজে কেন? ওর প্রকৃতি কেমন?
উত্তর: ‘ওর’ বলতে বোঝানো হয়েছে বলাইকে। কেউ গাছের ফুল তুললে ওর বাজে, কারণ বলাই ছিল প্রকৃতিপ্রেমী। তার প্রকৃতিতে গাছপালার মূল সুরগুলোই প্রবল ছিল। তার কাছে ফুল তোলা বা গাছের ক্ষতি করা ছিল ব্যথার বিষয়, যা সে কাউকে প্রকাশ করতে পারত না। বলাইয়ের প্রকৃতি ছিল শান্ত, ভাবুক, এবং গাছপালার প্রতি গভীর অনুরাগী।
ঙ) বলাইয়ের সঙ্গীরা ওকে খ্যাপাবার জন্য কী কী করতো?
উত্তর: গাছে ঢিল মেরে মেরে আমলকী পাড়ত, বাগানের ভিতর দিয়ে চলতে চলতে ছড়ি দিয়ে দু-পাশের গাছগুলোকে মারতে মারতে চলত, ফস্ ক’রে বকুলগাছের একটা ডাল ভেঙে নিত।
চ) একদিন বলাই ওর কাকিমার গলা জড়িয়ে ধরে কী বলেছিল?
উত্তর: বলাই বলেছিল, “ঐ ঘাসিয়াড়াকে বলো না, আমার ওই গাছগুলো যেন না কাটে”।
ছ) বলাই তার রক্তের মধ্যে বিশ্বপ্রাণের কী বাণী শুনতে পেয়েছিল?
উত্তর: বলাই তার রক্তের মধ্যে বিশ্বপ্রাণের “আমি থাকব, আমি থাকব” এই বাণী শুনতে পেয়েছিল।
জ) বলাই কখন চমকে উঠে কাকাকে কী অনুরোধ করেছিল?
উত্তর: যখন লেখক বললেন, “মালীকে বলতে হবে, এটা উপড়ে ফেলে দেবে”, তখন বলাই চমকে উঠে কাকাকে দু-পায়ে পড়ে অনুরোধ করেছিল, “না, কাকা, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, উপড়ে ফেলো না”।
ঝ) লেখক তাঁর ভাইপোকে কী বলে শিমূলগাছটা কেটে ফেলার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন?
উত্তর: লেখক বলেছিলেন, এর বদলে খুব ভালো কতকগুলো গোলাপের চারা আনিয়ে দেবেন। যদি শিমুল পছন্দ হয়, আরেকটা চারা পুঁতে দেবেন।
ঞ) শিমলা থেকে বলাইয়ের চিঠি এলে কাকিমা কী করেছিলেন?
উত্তর: কাকিমা লেখককে ডেকে বলেছিলেন, “ওগো শুনছ, একজন ফোটোগ্রাফওয়ালা ডেকে আনো”। গাছ কাটা হয়ে যাওয়ায় দুদিন অন্ন গ্রহণ করেননি, অনেকদিন লেখকের সঙ্গে কথা বলেননি।
৪. ৪/৫ বাক্যে উত্তর দাও:
ক) বলাইয়ের কাকিমা দুদিন অন্নগ্রহণ করেননি কেন?
উত্তর: শিমুল গাছটি বলাইয়ের প্রিয় ছিল। গাছটি কেটে ফেলার কারণে কাকিমার মনে গভীর আঘাত লেগেছিল, তাই তিনি দুদিন অন্ন গ্রহণ করেননি এবং লেখকের সঙ্গে অনেকদিন কথা বলেননি।
খ) বিলেত যাওয়ার পূর্বে বলাই শিমলে থেকে কাকিমাকে চিঠিতে কী লিখে পাঠিয়েছিল?
উত্তর: বলাই লিখেছিল, “কাকি আমার সেই শিমুলগাছের একটা ফোটোগ্রাফ পাঠিয়ে দাও”।
গ) ‘বলাই’ কেন ছোটবেলা থেকেই কাকিমার কাছে লালিত পালিত হয়েছে?
উত্তর: মাতৃহীন বলাই কাকির কোলে মানুষ হয়েছে। দাদার বিলেত যাত্রার সময়ও কাকির স্নেহে লালিত হয়েছে।
ঘ) ‘বলাই’ কখন চমকে উঠেছিল এবং কেন?
উত্তর: লেখক শিমুল গাছ কেটে ফেলার কথা বললে চমকে উঠেছিল।
ঙ) একদিন লেখককে তাঁর ভাইপোটি কোথায়, কখন, কেন ডেকে নিয়ে গিয়েছিল?
উত্তর: সকালে বাগানে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, একটি শিমুল চারা দেখাতে।
৬. রচনামূলক প্রশ্ন:
ক) বলাই-এর চরিত্র আলোচনা করো।
Ans.বলাই ছিল লেখকের ভাইপো এবং এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার চরিত্রে গাছপালার মূল সুরগুলোই প্রবল ছিল। সে ছিল একজন গভীর প্রকৃতিপ্রেমী ও ভাবুক। শৈশব থেকেই সে চুপচাপ চেয়ে চেয়ে প্রকৃতির বিচিত্র সৃষ্টিকে দেখত—কালো মেঘ, বৃষ্টি, আমের বোল, পুষ্পিত শালবন। কথা কম বলত বলে তাকে অনেক বেশি ভাবতে হত। দেবদারু বনের নিস্তব্ধ ছায়াতলে দাঁড়িয়ে তার গা ছমছম করত। সে নতুন অঙ্কুর, কচি পাতা ও নামহারা ফুলের প্রতি বয়স্যভাব অনুভব করত। কেউ ফুল তুললে বা গাছ কাটলে তার প্রাণে বাজত। সে বুঝতে পারত, তার কিছু ব্যথা সম্পূর্ণ ওর একলারই, যা কেউ বোঝে না। বলাই যেন বিশ্বপ্রাণের বাণী, ‘আমি থাকব, আমি বাঁচব’-এর প্রতীক ছিল, যার আসল বয়স সেই কোটি বৎসর আগেকার।
খ) ‘বলাই’ পাঠটি একটি প্রকৃতি বিষয়ক গল্প—এই আলোকে আলোচনা করো।
Ans.’বলাই’ গল্পটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতি বিষয়ক একটি শ্রেষ্ঠ রচনা। গল্পের মূল বিষয়ই হল প্রকৃতির সঙ্গে এক বালকের আত্মিক সম্পর্ক ও সেই সম্পর্কের গভীরতা। বালক বলাই-এর প্রকৃতিতে গাছপালার মূল সুরগুলোই প্রবল। সে প্রকৃতির নানা রূপ—বৃষ্টি, রোদ, পুষ্পিত শালবন, নতুন অঙ্কুরকে নিবিড়ভাবে অনুভব করে। বিশেষত, রাস্তার মাঝখানে গজিয়ে ওঠা একটি শিমুল গাছের প্রতি তার ভালোবাসা, তার কাছে ফুল বা চারাগাছের ক্ষতিতে বলাইয়ের কষ্ট পাওয়া—এ সবই গল্পটিকে গভীর প্রকৃতিপ্রীতির আলেখ্য করে তোলে। এমনকি, শিমুল গাছটি কাটা পড়লে তার কাকিমার শোক—’ঐ গাছ যে ছিল তাঁর বলাইয়ের প্রাণের দোসর’—উক্তিটির মাধ্যমে গল্পে প্রকৃতির স্থান বালকের জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গ) “তাদের সঙ্গে ওর কী যে একটা বয়স্যভাব তা ও কেমন করে প্রকাশ করবে।”—এখানে ‘তাদের’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? ‘ওর’-ই বা কে? ‘তাদের’ এবং ‘ওর’ চিরকালের সম্পর্কটা কী তা আলোচনা করো।
Ans.এখানে ‘তাদের’ বলতে বোঝানো হয়েছে বাগানের সদ্য গজিয়ে ওঠা কচি কচি পাতা এবং নতুন অঙ্কুরগুলোকে।
‘ওর’ হল গল্পের প্রধান চরিত্র বলাই।
‘তাদের’ এবং ‘ওর’ চিরকালের সম্পর্ক: এই সম্পর্কটি হল প্রাণের আদিম ও গভীর সংযোগ। বলাই যেন বিশ্বপ্রাণের বাণী, ‘আমি থাকব, আমি বাঁচব’-এর প্রতীক। গাছের সেই অন্তহীন প্রাণের বিকাশতীর্থের চিরপথিক রূপে সে যেন তার রক্তের মধ্যে প্রকৃতির মূল সুর শুনতে পেত। নতুন অঙ্কুর ও পাতাগুলি তার কাছে চির-অসমাপ্ত গল্পের মতো, যাদের সঙ্গে সে এক বয়স্যভাব বা বন্ধুত্বের অনুভব করত। এই সম্পর্ক কোটি বৎসর আগেকার সেই আদিম পৃথিবীর জন্মকালীন সময় থেকে প্রবাহিত, যখন প্রথম প্রাণ অর্থাৎ অরণ্য আপনার জন্মের ক্রন্দন উঠিয়েছিল।
ঘ) ‘বলাই’ গল্পের মাধ্যমে ওর প্রকৃতিপ্রীতির পরিচয় দাও।
Ans. ‘‘বলাই’ গল্পের মাধ্যমে বলাইয়ের প্রকৃতিপ্রীতির অসাধারণ পরিচয় পাওয়া যায়। সে প্রকৃতিকে গভীরভাবে অনুভব করত এবং প্রতিটি ক্ষুদ্র জীব ও উদ্ভিদকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করত—কালো মেঘের ভিড়, হঠাৎ বৃষ্টির ঝাপটা, আমের বোল, পুষ্পিত শালবন—সবকিছু তার চোখে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। তার প্রকৃতিপ্রেম ছিল আদিম ও অন্তর্নিহিত, যেন কোটি বছর আগের পৃথিবীর প্রাণের স্পন্দন তার রক্তে প্রবাহিত হয়। সে প্রকৃতির সঙ্গে এমন একটি সংযোগ স্থাপন করত, যা তাকে জীবন ও বাঁচার বাণী শোনাত।
বলাই ছোট ছোট উদ্ভিদের প্রতি বিশেষ স্নেহ দেখাত। ঘাসিয়ারার নিড়নি দিয়ে নামহারা ফুল ও চারাগাছ নষ্ট করলে সে কষ্ট পেত এবং কাকিমার কাছে তা নিয়ে নালিশ করত। সদ্য গজানো কচি কচি পাতা ও অঙ্কুর তার চির-অসমাপ্ত গল্পের অংশ ছিল, যাদের সঙ্গে তার গভীর বন্ধন তৈরি হত। রাস্তার মাঝখানে গজানো শিমুল গাছটি সে নিজের হাতে জল দিয়ে রক্ষা করত, যা তার কাছে জীবনের এক অনন্য সঙ্গী হয়ে উঠেছিল।
এভাবে বলাইয়ের প্রকৃতিপ্রীতি ছিল সজীব, অন্তর্নিহিত এবং দয়াশীল। ছোট-বড়, সব ধরনের জীব ও উদ্ভিদকে সে সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখত এবং তাদের প্রতি প্রেম ও যত্নের পরিচয় দিয়ে গল্পটি প্রকৃতিপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
৮. যোগ্যতা বিচার:
ক) প্রকৃতি-প্রীতির প্রয়োজনীয়তা কী?
Ans.প্রকৃতি-প্রীতি মানুষের জীবন ও মননের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বলাই গল্পের মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রকৃতি-প্রীতি জীবনের মূল সুর এবং বিশ্বপ্রাণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।
এটি মানুষের মনে সংবেদনশীলতা জন্মায়, যেমন বলাইয়ের ক্ষেত্রে চারাগাছ বা ফুলের ক্ষতিতে তার কষ্ট হতো।
প্রকৃতি-প্রীতি মানুষকে আধ্যাত্মিক ও মানসিক শান্তি দেয়। দেবদারু বনের নিস্তব্ধ ছায়াতলে বলাইয়ের একলা দাঁড়িয়ে থাকা বা ঘাসের আস্তরণে গড়িয়ে বেড়ানো তার প্রমাণ।
এটি মানুষের মধ্যে জীবনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা ও চিরন্তন প্রবাহের উপলব্ধি জাগায়, যা বলাইয়ের মাধ্যমে ‘আমি থাকব, আমি বাঁচব’ বাণীর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে।
এটি মানুষকে ব্যবহারিক চিন্তা (যেমন লেখক) থেকে সরিয়ে এনে বৃহত্তর প্রাণের মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে (যেমন কাকিমার শোক)।
খ) মানুষ-জীবজন্তুর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক আলোচনা করো।
Ans.মানুষ-জীবজন্তুর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক জটিল এবং অপরিহার্য।
পারস্পরিক অস্তিত্ব: মানুষ তার ইতিহাসের নানা পরিচ্ছেদে প্রকৃতির অঙ্গ। মানুষের মধ্যে নানা জীবজন্তুর প্রচ্ছন্ন পরিচয় পাওয়া যায়, যেমন বাঘ-গোরুকে এক খোঁয়াড়ে পুরে বা অহি-নকুলকে এক খাঁচায় ধরে মানুষ হয়।
জীবনের আধার: প্রকৃতি হল বিশ্বপ্রাণের মূক ধাত্রী। গাছপালা পৃথিবীর অমৃতভাণ্ডারের জন্য প্রাণের তেজ ও লাবণ্য সঞ্চয় করে, যা সমস্ত জীবজগতের অস্তিত্বের ভিত্তি।
আত্মিক সংযোগ: বলাইয়ের মতো সংবেদনশীল মানুষ রক্তের মধ্যে বিশ্বপ্রাণের বাণী শুনতে পায়। তার কাছে অঙ্কুরিত চারা ও কচি পাতা ছিল বন্ধুর মতো।
প্রকৃতিকে ক্ষুণ্ন করার প্রবণতা: অনেক মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে এই সংযোগ ভুলে গিয়ে ফুল তুলে বা অযাচিত গাছ কেটে প্রকৃতির ক্ষতি করে।
—
ক) “এই ছেলের আসল বয়স সেই কোটি বৎসর আগেকার।”
Ans .এই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথের বলাই নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
এই বাক্যে লেখক বলাইয়ের প্রকৃতিপ্রেম ও তার আদিম সংযোগের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বলাই শিশু হলেও তার প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুভূতি ও জ্ঞান শতবছরের মতো প্রাচীন ও অমোঘ। গাছ, ফুল, এবং বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক উপাদানের প্রতি তার গভীর অনুভূতি, যেন এই পৃথিবীর চিরস্থায়ী জীবনের সঙ্গে মিলিত। বলা যায়, শিশুর শৈশবকাল প্রকৃতির সঙ্গে তার এমন অন্তর্নিহিত সম্পর্ক তাকে একজন প্রজ্ঞাবান ও সংবেদনশীল মনোভাবের অধিকারী বানায়। পাঠক এখানে বুঝতে পারে, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ শুধু শৈশবের আনন্দ নয়, বরং মানুষের অন্তর্দৃষ্টি ও হৃদয়ের বিকাশের মূল দিক। বলাইয়ের চরিত্রের মাধ্যমে গল্পটি শিশুদের প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও জীবনদর্শনের শিক্ষাও দেয়।
—
খ) “এতদিনে এইসব চিহ্নকে ছাড়িয়ে গিয়ে বলাই অনেক বড়ো হয়ে উঠেছে।”
Ans .এই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথের বলাই নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
লেখক বলাইয়ের শৈশবকালীন স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতাকে উল্লেখ করে বোঝাচ্ছেন, সময়ের সঙ্গে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে বড়ো হয়েছে। ছোটবেলার খোঁজ, শিমুল গাছের প্রতি স্নেহ এবং প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ তাকে পরিপক্ক করেছে। এই বাক্যটি মানুষের বিকাশ ও অভিজ্ঞতার প্রতীক। শিশুর আনন্দ, উৎসাহ এবং আবেগ ধীরে ধীরে জীবনের জ্ঞান, দায়িত্ব এবং সংবেদনশীলতা হিসেবে বিকশিত হয়। পাঠক বুঝতে পারে, শৈশবের অনুধাবন ও অনুভূতি পরিণত বয়সের মনন ও শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে। এখানে বলা হয়েছে, স্মৃতি এবং প্রাকৃতিক অনুভূতি ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
—
গ) “বছর খানেকের মধ্যে গাছটা নির্লজ্জের মতো মস্ত বেড়ে উঠল।”
Ans .এই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথের বলাই নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
শিমুল গাছের দ্রুত বৃদ্ধি শিশু বলাইয়ের জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ককে চিহ্নিত করে। গাছটি যেন একটি প্রাণবান সত্তা, যা বলাইয়ের স্নেহ, যত্ন ও আবেগের প্রতিফলন। এটি শিশুর বন্ধু, তার আত্মিক সঙ্গী এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক। গাছের অসামান্য বৃদ্ধি জীবনের অগ্রগতির, শক্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। গল্পে এটি প্রকৃতির অদম্য শক্তি ও শিশুর মানসিক বিকাশের সাথে সংযুক্ত। পাঠক বুঝতে পারে, প্রকৃতির সৃষ্টিকে ভালোবাসা এবং যত্নের মাধ্যমে জীবনের সৌন্দর্য ও মানসিক বিকাশ অর্জন করা যায়।
—
ঘ) “তারা ওর চির-অসমাপ্ত গল্প।”
Ans .এই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথের বলাই নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
এই বাক্যটি বলাইয়ের অনুসন্ধিৎসু মন এবং প্রকৃতির প্রতি তার গভীর অনুরাগকে প্রকাশ করে। অঙ্কুরিত চারাগাছ, ফুল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ তার চিন্তাশীলতা ও কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করে। শিশু বলাই নিজের চারপাশের প্রাকৃতিক ঘটনার মাধ্যমে জীবন, সৃষ্টি এবং পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। “চির-অসমাপ্ত গল্প” নির্দেশ করছে, শিশুর কল্পনা ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা কখনও শেষ হয় না; এটি তার অন্তর্দৃষ্টি, অনুভূতি এবং সৃষ্টিশীলতার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। পাঠক বোঝে, শিশুর চিন্তা ও অনুভূতি ক্রমাগত বিকাশমান।
—
ঙ) “আমি চিরপথিক, মৃত্যুর পর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অন্তহীন প্রাণের বিকাশ তীর্থে যাত্রা করব রৌদ্রে-বাদলে, দিনে-রাত্রে।”
Ans .এই উক্তিটি রবীন্দ্রনাথের বলাই নামক গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে।
এই বাক্যটি গাছের অদম্য জীবনীশক্তি এবং তার স্থায়ী উপস্থিতি বোঝাচ্ছে। শিমুল গাছের উদাহরণ দিয়ে গল্পে দেখানো হয়েছে, প্রকৃতির শক্তি ও ধারাবাহিকতা মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলে। প্রাণের অনন্ত বিকাশ, ধৈর্য এবং সময়ের প্রবাহের সাথে সামঞ্জস্য—এই বিষয়গুলো শিশুর মানসিক ও নৈতিক বিকাশকে শক্তিশালী করে। গল্পে বলা হয়েছে, প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্তি জীবনের স্থায়িত্ব, সৌন্দর্য এবং মানবিক মূল্যবোধ শেখায়।
৭. পাঠনির্ভর ব্যাকরণ:
ক) নিচের শব্দগুলোর বিপরীত শব্দ লিখো:
বিস্তৃত: সংকীর্ণ, সীমিত
প্রচ্ছন্ন: প্রত্যক্ষ, প্রকাশিত
অব্যক্ত: প্রকাশিত
অন্তর: বাহির, বহিরঙ্গ
প্রকাণ্ড: ক্ষুদ্র, ছোট
অসমাপ্ত: সমাপ্ত, সম্পূর্ণ
নিষ্ঠুর: সদয়, দয়ালু
অমৃত: গরল, বিষ
নির্লজ্জ: লজ্জাশীল, সলজ্জ
নির্বোধ: বোধসম্পন্ন, বুদ্ধিমান
বন্ধুর: মসৃণ
ক্ষত: নিরাময়, সুস্থতা
প্রতিরূপ: বিপ্রতীপ
নিবিড়: আলগা, শিথিল
খ) রেখাঙ্কিত পদগুলোর কারক বিভক্তি নির্ণয় করো:
একদিন সকালে একমনে খবরের কাগজ পড়ছি। পদ: খবরের কাগজ, কারক: কর্ম কারক, বিভক্তি: শূন্য
বলাইয়ের কাঁচা হাতের লেখা চিঠি আমাকে দেখতে দিলেন। পদ: আমাকে, কারক: গৌণ কর্ম কারক, বিভক্তি: ‘কে’
মাঘের শেষে আমের বোল ধরে। পদ: আমের বোল, কারক: কর্তৃ কারক, বিভক্তি: শূন্য
বলাইয়ের কাকি দুদিন অন্ন গ্রহণ করলেন না। পদ: দুদিন, কারক: করণ/সময়ের আধার, বিভক্তি: শূন্য
বলাই সেই দেবদারু বনের নিস্তব্ধ ছায়াতলে একলা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পদ: দাঁড়িয়ে থাকে, কারক: নেই (ক্রিয়া)
গ) পদ পরিবর্তন করো:
সুন্দর → সৌন্দর্য
বিলেত → বিলাতি
চিন্তা → চিন্তিত, চিন্তনীয়
গোপন → গোপনীয়, গোপনতা
লোভ → লুব্ধ
চমৎকৃত → চমৎকার, চমক
প্রত্যহ → প্রাত্যহিক
বিস্তৃত → বিস্তার
অন্তর → আন্তরিক
পুষ্প → পুষ্পিত
উৎসুক → ঔৎসুক্য
প্রস্তাব → প্রস্তাবিত
গ্রহণ → গৃহীত
গম্ভীর → গাম্ভীর্য
বন্ধুর → বন্ধুরতা
