অসমে ব্রিটিশ প্রশাসনের সূচনা, Class-9

পঞ্চম অধ্যায়: অসমে ব্রিটিশ প্রশাসনের সূচনা
শুদ্ধ উত্তর বেছে বের করো

১. ব্রিটিশ জয়ন্তীয় রাজ্যের রাজা রাজেন্দ্র সিংহ / গোবিন্দচন্দ্র / তিরৎ সিংহকে সিলেটে নির্বাসন দিয়েছিল।
উত্তর: রাজেন্দ্র সিংহ।

২. অসমের শেষ আহোম রাজা ছিলেন চন্দ্রকান্ত সিংহ / কমলেশ্বর সিংহ / পুরন্দর সিংহ / যোগেশ্বর সিংহ।
উত্তর: পুরন্দর সিংহ।

৩. তিরৎ সিংহ খাসি / মণিপুরি / জয়ন্তীয়া দেশপ্রেমিক ছিলেন।
উত্তর: খাসি।

সংক্ষিপ্ত উত্তর দাও
১. গোবিন্দচন্দ্র কোন রাজ্যের রাজা ছিলেন?
উত্তর: গোবিন্দচন্দ্র কাছাড় রাজ্যের রাজা ছিলেন।

২. ডেভিড স্কট কে ছিলেন?
উত্তর: ডেভিড স্কট ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং অসমের প্রথম এজেন্ট বা কমিশনার।

৩. ডেভিড স্কটের পরবর্তী কমিশনার কে ছিলেন?
উত্তর: ডেভিড স্কটের পরবর্তী কমিশনার ছিলেন রবার্টসন।

৪. তিরৎ সিং কোন রাজ্যের সিয়েম ছিলেন?
উত্তর: তিরৎ সিং খাসি পাহাড়ের ‘নঙ্কলৌ’ (Nongkhlaw) রাজ্যের সিয়েম বা প্রধান ছিলেন।

৫. মটক রাজ্যের রাজার উপাধি কী ছিল?
উত্তর: মটক রাজ্যের রাজার উপাধি ছিল ‘বড় সেনাপতি’।

৬. জেনকিন্সের পরামর্শ অনুযায়ী কে সিংহাসন হারিয়েছিলেন?
উত্তর: জেনকিন্সের পরামর্শ অনুযায়ী আহোম রাজা পুরন্দর সিংহ তাঁর সিংহাসন হারিয়েছিলেন।

৭. জেনকিন্স নিম্ন অসমকে কী কী জেলায় ভাগ করেন?
উত্তর: জেনকিন্স নিম্ন অসমকে চারটি জেলায় ভাগ করেন: গোয়ালপাড়া, কামরূপ, দরং এবং নওগাঁ।

৮. ব্রিটিশ কাকে ৫০ হাজার টাকা বৃত্তি দিয়ে রাজ্য দখল করেছিল?
উত্তর: ব্রিটিশরা আহোম রাজা পুরন্দর সিংহকে বছরে ৫০ হাজার টাকা বৃত্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর রাজ্য দখল করেছিল।

রচনাধর্মী প্রশ্ন এবং উত্তর

১. ডেভিড স্কটের রাজস্ব নীতি কেমন ছিল?

উত্তর: ডেভিড স্কটের রাজস্ব নীতি ছিল কঠোর, নিয়ন্ত্রণমূলক ও করকেন্দ্রিক। তিনি আহোম শাসনামলের প্রচলিত পাইক প্রথা বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে মুদ্রাভিত্তিক কর ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। এই নতুন ব্যবস্থায় কৃষিজমির ওপর নির্দিষ্ট হারে খাজনা আরোপ করা হয় এবং কৃষিকাজের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশা ও জীবিকাভিত্তিক কর্মকাণ্ডের ওপরও কর বসানো হয়। এর ফলে যেসব মানুষ আগে শ্রমের মাধ্যমে রাষ্ট্রের জন্য কাজ করত, তারা হঠাৎ করেই নগদ অর্থে কর দিতে বাধ্য হয়।

এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কৃষকদের জন্য নগদ অর্থ জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। খাজনা আদায়ে প্রশাসনের কঠোরতা ও অনমনীয় আচরণ কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে ফসল নষ্ট হলেও কর মওকুফ করা হতো না, ফলে কৃষকদের আর্থিক দুরবস্থা আরও বৃদ্ধি পায়।

ডেভিড স্কটের এই রাজস্ব নীতির কারণে সমাজের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি চরম চাপে পড়ে। মানুষের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমতে থাকে। এই ক্ষোভ ও অসন্তোষই পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও আন্দোলনের রূপ নেয়। তাই বলা যায়, ডেভিড স্কটের রাজস্ব নীতি প্রশাসনিক দিক থেকে কার্যকর হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে তা ছিল অত্যন্ত জনবিরোধী।

২. ডেভিড স্কটের প্রশাসন কালে বিচারের ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল?

উত্তর: ডেভিড স্কটের প্রশাসনকালে অসমের বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও সংস্কার সাধিত হয়। তিনি আহোম শাসনামলের প্রাচীন ও প্রথাগত বিচার পদ্ধতির পরিবর্তে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ আইন ও নিয়মকানুন প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। এই সময় দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার জন্য পৃথক আদালত স্থাপন করা হয়, যা বিচার ব্যবস্থাকে একটি সুসংগঠিত কাঠামো দেয়। পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়ে বিচার কার্য সম্পাদনের জন্য পঞ্চায়েত ব্যবস্থারও প্রচলন করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে বিচার সহজলভ্য হয়।

তবে এই সংস্কারের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। উচ্চপদস্থ বিচারক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মূলত ব্রিটিশ হওয়ায় স্থানীয় ভাষা, সমাজ ও রীতিনীতির সঙ্গে তাদের পরিচিতি কম ছিল। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়। বিচার প্রক্রিয়া জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় দরিদ্র মানুষের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে ডেভিড স্কটের বিচার সংস্কার প্রশাসনিকভাবে আধুনিক হলেও তা পুরোপুরি জনমুখী হয়ে উঠতে পারেনি।

৩. রবার্টসনের আমলে রাজস্ব ব্যবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: রবার্টসনের আমলে রাজস্ব ব্যবস্থা আরও সুসংগঠিত ও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি ডেভিড স্কট প্রবর্তিত কর ব্যবস্থাকেই অব্যাহত রাখেন এবং তা আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার চেষ্টা করেন। এই সময়ে করের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়। রবার্টসন জমির সঠিক মূল্য নির্ধারণের জন্য নিয়মিত জরিপ চালু করেন এবং সেই অনুযায়ী খাজনা নির্ধারণের উদ্যোগ নেন।

তবে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোরতা ও অনমনীয়তা মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে। অনেক কৃষকই নির্ধারিত খাজনা পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়ে। জমির উৎপাদন কম হলেও খাজনায় ছাড় না দেওয়ায় কৃষকদের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ফলে রবার্টসনের রাজস্ব নীতি জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ আরও তীব্র হয়।

৪. মেজর জেনকিন্স অসমের জন্য কী কী কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর: মেজর জেনকিন্স অসমে ব্রিটিশ প্রশাসনের অন্যতম একজন দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি শিক্ষা বিস্তারে সহায়তা করেন এবং রাস্তাঘাট নির্মাণে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি অসমে চা শিল্পের উন্নয়নে উৎসাহ দেন এবং প্রথমবার চা বাগিচা তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। এছাড়া স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতেও তিনি কিছু সংস্কার করেন।

৫. জেনকিন্স কীভাবে অসমকে বিভিন্ন জেলায় বিভক্ত করেছিলেন?
উত্তর: মেজর জেনকিন্স অসমের জন্য নানা কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের একজন দক্ষ শাসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি অসমে শিক্ষার প্রসারের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেন এবং বিদ্যালয় স্থাপন ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়তা করেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন, যার ফলে প্রশাসনিক কাজকর্ম ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ সহজ হয়।

মেজর জেনকিন্স অসমে চা শিল্পের সম্ভাবনা অনুধাবন করে এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর উদ্যোগেই প্রথমবারের মতো চা বাগান স্থাপনের কাজ শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে অসমের অর্থনীতির একটি প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়। এছাড়াও তিনি কৃষিক্ষেত্রে উন্নত পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করেন এবং কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহ দেন।

স্বাস্থ্য খাতেও মেজর জেনকিন্স কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। সব মিলিয়ে তাঁর শাসনামলে অসমে শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে যে অগ্রগতি ঘটে, তা রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৬. তিরৎ সিং কে ছিলেন? তিনি কেন ব্রিটিশ বিরোধী হয়েছিলেন?
উত্তর: তিরৎ সিং ছিলেন খাসি পাহাড় অঞ্চলের নঙ্কলৌ (নংখ্লাও) রাজ্যের সিয়েম বা প্রধান। তিনি ছিলেন একজন সাহসী ও দেশপ্রেমিক শাসক, যিনি ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তিরৎ সিং খাসি জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক খাসি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।

প্রথমদিকে তিরৎ সিং ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে যায়। ব্রিটিশ সরকার খাসি পাহাড়ের ভেতর দিয়ে সমতল অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করে। এই রাস্তা নির্মাণের ফলে খাসি পাহাড়ের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ব্রিটিশরা তাঁর ওপর নানা কঠোর শর্ত আরোপ করে এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করতে থাকে।

এই বিদেশি আধিপত্য ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তিরৎ সিং মেনে নিতে পারেননি। নিজের রাজ্য ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এর ফলস্বরূপ তিনি ইংরেজদের সঙ্গে দীর্ঘদিন সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত হন, তবুও তাঁর সংগ্রাম উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

সংক্ষিপ্ত টীকা
(ক) ডেভিড স্কট: ডেভিড স্কট ছিলেন অসমের প্রথম ব্রিটিশ কমিশনার। ১৮২৪–২৬ সালের বার্মা যুদ্ধের পর তিনি অসমে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা করেন। তাঁর আমলে রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনা হয়। ব্রিটিশ আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি অসমের শাসনব্যবস্থাকে সংগঠিত করেন এবং আধুনিক প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন।

(খ) রবার্টসন: রবার্টসন ডেভিড স্কটের মৃত্যুর পর অসমের ব্রিটিশ কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর শাসনকালে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়। তিনি কর আদায়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি প্রশাসনকে সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করেন। তাঁর নীতির ফলে প্রশাসনিক দৃঢ়তা বাড়লেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

(ঘ) তিরৎ সিং: তিরৎ সিং ছিলেন খাসি পাহাড়ের একজন নির্ভীক দেশপ্রেমিক নেতা ও স্বাধীনচেতা শাসক। ব্রিটিশদের অন্যায় হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিনি সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন। খাসি জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। তাঁর সাহস ও আত্মত্যাগ উত্তর–পূর্ব ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে স্মরণীয় হয়ে আছে।

(ঙ) গোবিন্দচন্দ্র: গোবিন্দচন্দ্র ছিলেন কাছাড় রাজ্যের শেষ রাজা। তাঁর শাসনকাল ছিল অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সংকটে ভরা। গোবিন্দচন্দ্রের মৃত্যুর পর কাছাড়ে আর কোনো স্বাধীন শাসক অবশিষ্ট থাকেনি। এই সুযোগে ব্রিটিশ সরকার কাছাড় রাজ্যকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের দখলে নেয় এবং সেখানে সরাসরি ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *