অর্থনৈতিক উন্নয়ন
অর্থনৈতিক উন্নয়ন
নিচে অনুশীলনী প্রশ্নগুলির সমাধান দেওয়া হলো:
অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর
১। ব্যাখ্যা করো (এক-দুটি বাক্যে)
(ক) অর্থনৈতিক বিকাশ
উত্তর: অর্থনৈতিক বিকাশ হচ্ছে একটি দেশের জাতীয় আয় এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়া।
(খ) অর্থনৈতিক উন্নয়ন
উত্তর: অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটলেই যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে তা বলা যায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো এমন প্রক্রিয়া, যেখানে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সুফল জনসংখ্যার বৃহৎ অংশের কাছে পৌঁছায় এবং আয় বিতরণে ব্যবধান বৃদ্ধি পায় না। বিলাসী সামগ্রীর পরিবর্তে নিত্য ব্যবহৃত সামগ্রীর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে, এবং পরিবেশ দূষিত না হলে, সেই বিকাশকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলা যায়। এটি অর্থনৈতিক বিকাশের চেয়ে প্রসারিত অর্থে ব্যবহৃত হয়।
(গ) মানব উন্নয়ন
উত্তর: মানব উন্নয়ন বলতে জনসাধারণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনধারণের মানদণ্ড, আর্থ-সামাজিক, ও রাজনৈতিক পরিবেশ ইত্যাদির উন্নয়ন বোঝায়। সম্প্রতি একটি দেশের উন্নয়নের সামগ্রিক ছবি ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ (HDI) ব্যবহার করে প্রকাশ করা হয়।
(ঘ) অর্থনৈতিক পরিকল্পনা
উত্তর: অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হলো নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার উদ্দেশ্যে এক কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা দেশের অর্থনীতির স্বেচ্ছাকৃত নিয়ন্ত্রণ এবং দিগদর্শন।
(ঙ) গণতান্ত্রিক পরিকল্পনা
উত্তর: যে-পরিকল্পনার প্রস্তুতিতে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা হয়, এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাই হলো গণতান্ত্রিক পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে দেওয়া হয় না।
(চ) উদারীকরণ
উত্তর: উদারীকরণ হলো দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা। এর মাধ্যমে শিল্প-খণ্ডে, বিত্ত-খণ্ডে, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ-খণ্ডে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়েছে।
(ছ) বেসরকারীকরণ
উত্তর: বেসরকারীকরণ হলো সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খণ্ডে অবাধ প্রবেশ করিয়ে দেবার নীতি। নির্বিনিয়োজন হলো বেসরকারীকরণের একটি ছোট সংস্করণ।
(জ) গোলোকিকরণ বা বিশ্বায়ন
উত্তর: একটি দেশের অর্থনীতির সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থনীতির সংযোগ স্থাপন বা সংহতি সাধন করাই হলো গোলোকিকরণ বা বিশ্বায়ন। এটি উদারীকরণ এবং বেসরকারীকরণের পরিণতিও বলা যায়।
সংক্ষিপ্ত উত্তরের প্রশ্ন
২। অর্থনৈতিক বিকাশ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের দুটি প্রধান পার্থক্যের উল্লেখ করো।
উত্তর: অর্থনৈতিক বিকাশ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের দুটি প্রধান পার্থক্য হলো –
সংজ্ঞা/লক্ষ্য: অর্থনৈতিক বিকাশ মূলত একটি দেশের জাতীয় আয় এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়াকে বোঝায়। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে সেই বিকাশকে বোঝায় যেখানে আয় বৃদ্ধির সুফল সমাজের অধিকাংশ লোকের মধ্যে যুক্ত হয় এবং আয় বৈষম্য হ্রাস পায়।
অর্থের প্রকৃতি: অর্থনৈতিক বিকাশের অর্থ সীমিত। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্থ প্রসারিত। অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটলেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, একথা বলা যায় না, কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক বিকাশের বিশেষ প্রয়োজন আছে।
৩। মানব উন্নয়নের তিনটি সূচক কী কী?
উত্তর: মানব উন্নয়নের তিনটি সূচক হলো – ১। প্রত্যাশিত আয়ু (জন্মের সময় একটি শিশু কত বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকবে বলে আশা করা যায়)। ২। শিক্ষা (প্রাপ্তবয়স্কের সাক্ষরতা এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও অন্যান্য প্রশাখাগুলির সর্বমোট নামভর্তির অনুপাতের ভিত্তিতে নির্ধারিত জ্ঞানের স্তর)। ৩। জীবন-যাত্রার মানদণ্ড।
৪। সমষ্টিগত পছন্দের বিস্তার সাধন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সমষ্টিগত পছন্দের বিস্তার সাধন বলতে জনসাধারণের সমষ্টিগত পছন্দের পরিধি বা সুযোগ বৃদ্ধি করাকে বোঝায়। মানব উন্নয়নের মূল কথা হলো জনসাধারণের সমষ্টিগত পছন্দের বিস্তার-সাধন, যা অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পছন্দগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থনৈতিক বিকাশে কেবল একটি পছন্দের (আয়) উল্লেখ থাকে, কিন্তু মানব উন্নয়নে এই সমষ্টিগত পছন্দের বিস্তার সাধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৫। ভারতবর্ষের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার চারটি মূল লক্ষ্য উল্লেখ করো।
উত্তর: ভারতবর্ষের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার চারটি মূল লক্ষ্য হলো – ১। উন্নয়নের হার গতিশীল করা। ২। আর্থ-সামাজিক বৈষম্য দূর করা। ৩। সুস্থায়ী উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা। ৪। দরিদ্রতা নির্মূল করা।
৬। NITI আয়োগের সদস্য কে বা কারা?
উত্তর: NITI আয়োগের সদস্যরা হলেন –
সভাপতি (অধ্যক্ষ): প্রধানমন্ত্রী।
উপাধ্যক্ষ: প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা নিযুক্ত।
পূর্ণকালীন সদস্য: তিনজন বিশেষজ্ঞ।
অংশকালীন সদস্য: দুজন।
পদাধিকার সদস্য: সর্বাধিক চারজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
মুখ্য কার্যাধিপ (CEO): একজন ভারতীয় অধিকর্তা।
প্রশাসনিক পরিচালনা পরিষদ: সকল মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলের সকল উপ-রাজ্যপালগণ।
বিস্তারিত উত্তর লেখো
৭। ভারতবর্ষের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথম (১৯৫১-১৯৯১) এবং দ্বিতীয় (১৯৯১ থেকে বর্তমান সময়সীমা) পর্বের মধ্যে কী পার্থক্য রয়েছে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ভারতবর্ষের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথম (১৯৫০-৫১ থেকে ১৯৯০-৯১) এবং দ্বিতীয় (১৯৯১-৯২ থেকে বর্তমান সময়সীমা) পর্বের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি হলো –
মূল চালিকা শক্তি: প্রথম পর্বে সরকারি খণ্ড প্রধান ভূমিকা নেয়; ব্যক্তিগত খণ্ডের ভূমিকা ছিল গৌণ। অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষ ভাবে প্রাধান্য পায়। দ্বিতীয় পর্বে উদারীকরণ, বেসরকারীকরণ এবং বিশ্বায়নের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়; সরকারি খণ্ডের গুরুত্ব হ্রাস পায়।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: প্রথম পর্বে মিশ্র অর্থনীতি ছিল, তবে সরকারি খণ্ডের গুরুত্ব বেশি ছিল। দ্বিতীয় পর্বে মিশ্র অর্থনীতি বজায় থাকলেও বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির দিকে ঝোঁক বাড়ে।
মূল লক্ষ্য: প্রথম পর্বে লক্ষ্য ছিল আত্মনির্ভরশীলতা, আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগ এবং সামাজিক ন্যায়। দ্বিতীয় পর্বে লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার বৃদ্ধি করা।
উন্নয়নের হার: প্রথম পর্বে জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার গড়ে ৩.৫ শতাংশ ছিল। দ্বিতীয় পর্বে উন্নয়নের হার বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৫-০৮ সালের মধ্যে ৯ শতাংশের উপরে পৌঁছায়।
অন্যান্য বৈশিষ্ট্য: প্রথম পর্বে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয়, কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পায়। দ্বিতীয় পর্বে মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক বাণিজ্যের সংকট এবং বৃহৎ বিত্ত সংকট দেখা দেয়।
৮। ভারতবর্ষে অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তনের মূল কারণ সংক্ষেপে বর্ণনা করো।
উত্তর: ভারতবর্ষে অর্থনৈতিক সংস্কার (উদারীকরণ, বেসরকারীকরণ এবং বিশ্বায়ন) প্রবর্তনের তিনটি মূল কারণ হলো – ১। বৃহৎ বিত্ত সংকট – সরকারি আয় কমে যাওয়া এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ২। মুদ্রাস্ফীতি – সীমিত উৎপাদনের ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি সমাজের দরিদ্র শ্রেণিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। ৩। বৈদেশিক বাণিজ্যের সংকট – ১৯৯০-৯১ সালে বৈদেশিক মূলধনের ঘাটতি ভয়াবহ আকার নেয়, ফলে ভারতকে সংস্কারের পথে হাঁটতে হয়।
৯। অর্থনৈতিক সংস্কারের তিনটি সুফল উল্লেখ করো।
উত্তর: অর্থনৈতিক সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে প্রাপ্ত তিনটি সুফল হলো – ১। অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২। পাইকারি মূল্যসূচি হ্রাস পেয়েছে। ৩। বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার বৃদ্ধি পেয়েছে।
১০। অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তনের ফলে উদ্ভূত দুটি সমস্যা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তনের ফলে উদ্ভূত দুটি সমস্যা হলো – ১। প্রতিযোগিতার তীব্রতা বৃদ্ধি, যার ফলে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ২। ভোগবাদী অর্থনীতির সৃষ্টি, যা সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটাতে পারে।
১১। অসমের চলিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করো।
উত্তর: অসমের চলিত অর্থাৎ দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১২–২০১৭) পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য হলো – ১। অসমের উন্নয়ন হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা। ২। দারিদ্র ও বৈষম্য হ্রাস করা। ৩। বন্যা ও ভূমিস্খলন সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান। ৪। কৃষি-খণ্ডের বার্ষিক উন্নয়নের হার ৬ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা। ৫। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খণ্ডে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে মানব উন্নয়ন সূচক (HDI) উন্নত করা।
