অরণ্যপ্রেমিক: লবটুলিয়ার কাহিনী’
‘অরণ্যপ্রেমিক: লবটুলিয়ার কাহিনী’
অরণ্যপ্রেমিক: লবটুলিয়ার কাহিনী – প্রশ্নোত্তর
১. অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
ক) লবটুলিয়ার কোন বুনো ফুল বসন্তের আগমনী বার্তা ঘোষণা করেছে?
উত্তর: লবটুলিয়ার মাঠে মাঝে মাঝে দুধফুল (দুধদলি ঘাসের ফুল) ফুটে বসন্তের আগমনী বার্তা ঘোষণা করেছে।
খ) বাংলাদেশের কী কী গাছপালা বা গাছগাছালির কথা হঠাৎ লেখকের মনে পড়েছিল?
উত্তর: হঠাৎ লেখকের মনে পড়েছিল নিমের ফুল ও পাঁচ-ছয়টা আম-কাঁঠালের বাগান-এর কথা।
গ) এই পাঠে যে সমস্ত ভ্রমণকারীর কথা বলা হয়েছে তারা কারা?
উত্তর: এই পাঠে উল্লিখিত ভ্রমণকারীরা হলেন- মার্কো পোলো, শেকলটন, আর্নেস্ট শ্যাকলটন, এবং হেনরি হ্যাডসন।
ঘ) মোহনপুরা জঙ্গলে কী কী বন্যপ্রাণী দেখা যায়?
উত্তর: মোহনপুরা জঙ্গলে বুনো মহিষের (বুনো মহিষ) ভয়ানক আনাগোনা, এবং বুনো শূকর ও বাঘের (বুনো মহিষ, বাঘ) ভয় রয়েছে।
ঙ) বনে পথ হারিয়ে লেখক কী করে দিক নির্ণয় করেন?
উত্তর: লেখক কাঁঠাল গাছের টুংটাং শব্দ শুনে দিক নির্ণয় করতেন।
২. সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
ক) কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে লেখকের কী অনুভূতি হয়েছিল?
উত্তর: কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে লেখকের এই অনুভূতি হয়েছিল যে বন-পাহাড় যেন এক শান্ত, স্তব্ধ, অথচ এক আশ্চর্য রূপের সৃষ্টি করেছে। তাঁর মনে হয়েছিল যেন এই জগত কোনো এক অজানা গ্রহের রচনা।
খ) সরস্বতী কুণ্ডীর একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।
উত্তর: সরস্বতী কুণ্ডী হলো লবটুলিয়ার উত্তর প্রান্তের একটি বিরাট হ্রদ বা জলাশয়। এই হ্রদের তিন দিক ঘন জঙ্গলে ঘেরা। এর নীল জল প্রায় দেড় মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বন নানাবিধ লতাপাতা ও বন্যপুষ্পের ভিড়ে পূর্ণ।
গ) সরস্বতী কুণ্ডীর বনে কী কী পাখি দেখা যায় তাদের নাম লেখো।
উত্তর: সরস্বতী কুণ্ডীর বনে যে সব পাখির আনাগোনা শোনা যায়, তাদের মধ্যে রয়েছে শ্যামা, শালিক, হরিয়ল, বনটিয়া, চাতক, ঘুঘু, এবং জলচর পাখি যেমন বক, সিসি, রাঙা হাঁস, মানিকপাখি ও কাক।
ঘ) বন্য হরিণ সম্পর্কে এই পাঠে কী বলা হয়েছে?
উত্তর: এই পাঠে বন্য হরিণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা লেখকের মহলে অর্থাৎ জঙ্গলে থাকলেও আগে কখনো চোখে পড়েনি। লেখক একবার একটি হরিণশাবককে (বড় হরিণ নয়, হরিণশাবক) ঘন লতা-পাতার ঝোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন। এটি ছিল নির্বাক ও নিস্পন্দ, যেন মানুষের মতো কৌতূহলী দৃষ্টিতে লেখকের দিকে চেয়ে আছে।
ঙ) ভোমরা লতা কী? এটি দেখতে কেমন? এর ফুল কেমন রঙের?
উত্তর: ভোমরা লতা (ভোঁমরা লতা) হলো এক ধরনের বন্য লতা যা গাছের মাথায় উঠে আশপাশ জুড়ে থাকে। এটি দেখতে বড় বড় বুনো শিমের মতো সবুজ ফল ধরে। এর ফুলগুলো ছোট্ট ছোট্ট ঝুমকোর (ছোট ছোট বনঝুমকো) মতো সাদা রঙের হয়।
৩. রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
ক) ‘এই সরস্বতী কুণ্ডীর ধারে একদিন দুপুরে এক অদ্ভুত লোকের সন্ধান পাইলাম’- কে এই ব্যক্তি? সে কী করছিল?
উত্তর:লেখক যাকে সরস্বতী কুণ্ডীর ধারে দুপুরে দেখেছিলেন, তিনি ছিলেন যুগলপ্রসাদ। তিনি লবটুলিয়া পরগনার বনবিভাগের একজন বনপ্রেমিক ও প্রকৃতিপ্রেমিক।
যুগলপ্রসাদ গোপনে বনের বিভিন্ন স্থানে বুনো ফুল ও লতার বীজ পুঁতছিলেন। তিনি পূর্ণিয়া, ভাগলপুর ও অন্যান্য দূরবর্তী অঞ্চলের বীজ সংগ্রহ করে এনে এই বনভূমিকে নতুন ফুলের সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ও বিনামূল্যে প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।
খ) যুগলপ্রসাদের কী শখ? সে বনের ভেতরে কী করে বেড়ায়?
উত্তর: যুগলপ্রসাদের শখ হলো অরণ্য ও প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। তিনি এই বিশাল বনভূমির সৌন্দর্য ও সম্পদ বাড়ানোর জন্য তাঁর নিজস্ব অর্থ ও সময় ব্যয় করতেন। তিনি বনের ভেতরে নানান ধরনের ফুলের বীজ, লতাপাতার কাটিং সংগ্রহ করে সরস্বতী কুণ্ডীর বনভূমিতে রোপণ করে বেড়ান। লেখকের কাছে যুগলপ্রসাদের এই কাজটি ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়, কারণ তিনি বিনাস্বার্থে কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই তা করতেন।
গ) পূর্ণিয়া থেকে সে কী এনেছে? লেখক তাকে কলকাতা থেকে কী এনে দিয়েছেন?
উত্তর: যুগলপ্রসাদ পূর্ণিয়ার বন থেকে এক ধরনের ভারী ও চমৎকার লতানো ফুল-এর বীজ এনেছিলেন।
লেখক তাঁকে কলকাতা থেকে সাতনা বুনো ফুলের বীজ এবং দ্বার্ভা পাহাড় থেকে বুনো ঝুমকোলতার কাটিং এনে দিয়েছিলাম।
ঘ) আজকের দিনের নিরীখে যুগলপ্রসাদকে একজন পরিবেশবিদ বলা যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, আজকের দিনের নিরিখে যুগলপ্রসাদকে নিঃসন্দেহে একজন পরিবেশবিদ বলা যায়। কারণ, তাঁর চিন্তা ও কর্ম ছিল প্রকৃত পরিবেশ সংরক্ষণের আদর্শ উদাহরণ। তিনি কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, নিছক প্রকৃতিপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে বুনো ফুলের বীজ রোপণ করতেন। তাঁর এই উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার এক নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা। যুগলপ্রসাদের কাজ আমাদের আধুনিক পরিবেশচেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সাযুজ্যপূর্ণ। তিনি বুঝেছিলেন, প্রকৃতির সুরক্ষা মানেই মানুষের মঙ্গল। তাই বলা যায়, যুগলপ্রসাদ ছিলেন এক নীরব অথচ সত্যিকারের পরিবেশপ্রেমিক, যিনি নিজের আনন্দে প্রকৃতিকে লালন করেছিলেন।
ঙ) লেখক কেন যুগলপ্রসাদকে বললেন যে তাঁর এই প্রয়াস যেন গোপন থাকে?
উত্তর: লেখক যুগলপ্রসাদকে তাঁর এই প্রয়াস গোপন রাখতে বলেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন—সমাজ এখনো এমন নিঃস্বার্থ প্রকৃতিপ্রেমকে উপলব্ধি করার মতো পরিণত হয়নি। মানুষ বাহ্যিক সাফল্য ও স্বার্থের মূল্য বোঝে, কিন্তু প্রকৃতির প্রতি একান্ত মমত্ববোধকে তারা প্রায়ই উপহাস করে। লেখক নিজেও এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন—লতাপাতা, ফুল ও গাছের প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে অনেকেই পাগলামি বলে ভেবেছিল। তাই তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, যুগলপ্রসাদের নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা লোকের ভ্রান্ত ধারণা ও সমালোচনার শিকার হতে পারে। তাঁর ইচ্ছা ছিল, প্রকৃতিপ্রেম যেন নিঃশব্দে, লোকচক্ষুর আড়ালে, অন্তরের আনন্দ হিসেবেই লালিত হয়।
